মার্কিন ডলারের বিপরীতে আবারও দুর্বল হচ্ছে বাংলাদেশি টাকা। আন্তঃব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের পাশাপাশি খোলাবাজারেও বেড়েছে ডলারের দাম। রাজধানীর খোলাবাজারে প্রতি ডলারের দর ১২৮ টাকা ছাড়িয়েছে। ফলে গত কয়েক দিন ধরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলারের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৪ টাকা ২২ পয়সায়। একই দিনে স্পট মার্কেটে প্রতি ডলার বিক্রি হয়েছে ১২৪ টাকা ৩৫ থেকে ১২৪ টাকা ৫০ পয়সায়। অথচ ১৫ দিন আগেও স্পট মার্কেটে প্রতি ডলারের দাম ছিল ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লেনদেন ও ঋণপত্রের (এলসি) দায় পরিশোধেও ডলারের দাম বেড়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে প্রতি ডলারের বিপরীতে দিতে হচ্ছে ১২৪ টাকা ২১ পয়সা। মাসের শুরুতে এ দর ছিল ১২৩ টাকা ১১ পয়সা। অর্থাৎ মাসের ব্যবধানে এলসি নিষ্পত্তিতে ডলারের দাম বেড়েছে ১ টাকা ১০ পয়সা।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং দেশের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ডলারের চাহিদা বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ ও উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় জ্বালানি ও সারসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির বিল পরিশোধে সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতে অতিরিক্ত ডলারের প্রয়োজন হচ্ছে। পাশাপাশি রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেশি থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি খোলাবাজারেও ডলারের দাম বেড়েছে। রাজধানীর মতিঝিলের বিভিন্ন মানি এক্সচেঞ্জ সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার খোলাবাজারে প্রতি ডলার কিনতে ১২৮ টাকা থেকে ১২৮ টাকা ২০ পয়সা পর্যন্ত দিতে হয়েছে। অন্যদিকে ডলার বিক্রি করতে আসা গ্রাহকদের দেওয়া হয়েছে ১২৭ টাকা ৭০ থেকে ১২৭ টাকা ৮০ পয়সা।
অথচ এক মাস আগেও খোলাবাজারে প্রতি ডলারের দাম ছিল ১২৫ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১২৬ টাকা ২০ পয়সার মধ্যে। ফলে এক মাসের ব্যবধানে ডলারের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
ডলারের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়তে পারে আমদানিনির্ভর নিত্যপণ্যের দামে। পাশাপাশি বিদেশে পড়াশোনা, চিকিৎসা ও ভ্রমণের জন্য ডলার কিনতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।
রিজার্ভ থেকে ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার বিক্রি
বাজারে ডলারের চাহিদা ও দাম বাড়ার মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে প্রতি ডলার ১২৪ থেকে ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা দরে বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংকগুলোর মোট ডলারের চাহিদা ছিল ৮০ কোটি ডলার। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরবরাহ করেছে ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার। এর আগে গত ২০ অক্টোবর প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৬৫ পয়সা দরে বিক্রি করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংকাররা জানান, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্স হাউসগুলোর কাছ থেকে প্রতি ডলার ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ১২৪ টাকা ৫০ পয়সা দরে কেনার প্রস্তাব পাচ্ছিল। কয়েকটি ব্যাংক ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা দরেও ডলার কিনেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রির পর রেমিট্যান্স হাউসগুলো তুলনামূলক কম দরে ডলার বিক্রির প্রস্তাব দেয়।
ব্যাংকারদের ভাষ্য, ৩০ কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক পেমেন্ট থাকায় বাজারে চাহিদার চাপ বেড়েছে। একই সঙ্গে মাসের শেষ দিকে প্রবাসী আয় তুলনামূলক কম আসায় ডলারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।
একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকগুলোতে ডলারের চাহিদা রয়েছে এবং চলতি মাসে আরও কয়েকটি বড় পেমেন্ট করতে হবে। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ করলে বাজার স্থিতিশীল থাকতে পারে। আরও কয়েক দফা ডলার বিক্রি করা হলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত রিজার্ভ থেকে মোট ১৫ কোটি ৩৫ লাখ ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অক্টোবরের প্রথম ২৭ দিনে প্রবাসীরা দেশে ২৫৪ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন।
অন্য একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মূলত পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বৈদেশিক পেমেন্টের পরিমাণ বেশি থাকায় গত কয়েক দিনে ডলারের চাহিদা বেড়েছে।
You cannot copy content of this page