মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছোট ছেলে ব্যারন ট্রাম্প রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিভিন্ন হুমকির মধ্যে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত জীবন কাটাচ্ছেন। ২০ বছর বয়সী ব্যারন নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে দ্বিতীয় বর্ষ শেষ করেছেন। গ্রীষ্মের বেশির ভাগ সময় তিনি মা, ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে নিউ জার্সির ট্রাম্প ন্যাশনাল গলফ ক্লাব বেডমিনস্টারে কাটিয়েছেন।
দ্য নিউইয়র্ক পোস্টের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট। ট্রাম্প পরিবারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র ব্যারনের বর্তমান জীবনযাপন সম্পর্কে তথ্য দিয়েছে। আরেকটি সূত্র তাকে ‘বেশ অন্তর্মুখী’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
২০২৪ সালের জুলাই থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর অন্তত তিনটি হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। পেনসিলভানিয়ার বাটলারে নির্বাচনি সমাবেশে গুলিতে আহত হন তিনি। একই বছরের সেপ্টেম্বরে ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচের গলফ কোর্সে এক সন্দেহভাজন ব্যক্তি তাকে অনুসরণ করেন। চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস ডিনারে ট্রাম্প উপস্থিত থাকার সময়ও এক বন্দুকধারীর হামলার ঘটনা ঘটে।
এসব ঘটনার পাশাপাশি ব্যারন ট্রাম্পকেও হুমকির লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্প্রতি ইরান থেকে ‘ব্যারন ট্রাম্পকে কোথায় হত্যা করা যায়’—এমন শিরোনামে একটি ভিডিও প্রকাশের অভিযোগ উঠেছে। ভিডিওটিতে ব্যারনের চলাচল দেখানো হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। একই সঙ্গে তার মাথার জন্য ১ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মেলানিয়া ট্রাম্পও ইরানিদের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু বলে দাবি করা হয়েছে।
এসব হুমকির ঘটনা ব্যারনের ওপর প্রভাব ফেলেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রক্ষণশীল কর্মী চার্লি কার্কের হত্যাকাণ্ডেও তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হন। কার্কের সঙ্গে ব্যারনের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কার্কের মৃত্যুর খবর বাবাকে জানানোর সময় ব্যারন বলেছিলেন, ‘তুমি বাইরে গেলে এটাই হয়।’ লেখক ম্যাগি হ্যাবারম্যান ও জোনাথন সোয়ানের সাম্প্রতিক বই ‘রেজিম চেঞ্জ’-এ প্রথম এই বক্তব্য প্রকাশিত হয়। পরে দ্য নিউইয়র্ক পোস্টও তা নিশ্চিত করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যারনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে গোপনীয়তা বজায় রাখার অনুরোধ জানিয়েছে ফার্স্ট লেডির কার্যালয়। দ্য নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক বক্তব্যে কার্যালয়টি জানায়, সাম্প্রতিক হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে ব্যারনের ব্যক্তিগত জীবনসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করার অনুরোধ করা হয়েছে।
মেলানিয়া ট্রাম্প তার ছেলের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক। ২০২২ সালের মার্চে ব্যারনের বয়স ১৬ বছর পূর্ণ হওয়ার পর তার সিক্রেট সার্ভিস নিরাপত্তা প্রত্যাহারের কথা থাকলেও মেলানিয়ার অনুরোধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তৎকালীন বাইডেন প্রশাসনের এক সাবেক কর্মকর্তা জানান, ওই অনুরোধ দ্রুত অনুমোদন করা হয়েছিল।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে তৈরি মেলানিয়ার তথ্যচিত্রেও ব্যারনের লাজুক স্বভাবের কথা উঠে আসে। উদ্বোধনী প্যারেডে পরিবারের সঙ্গে অংশ নেওয়ার প্রসঙ্গে সিক্রেট সার্ভিস সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সময় মেলানিয়া বলেছিলেন, ব্যারন বাইরে যাবে না এবং তিনি তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করেন। শেষ পর্যন্ত ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে উদ্বোধনী প্যারেড ঘরের ভেতরে অনুষ্ঠিত হয়।
ব্যারনের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা তাকে সুরক্ষা দিলেও চারপাশের সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে তার সচেতনতা বাড়িয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। নিরাপত্তা এজেন্টদের সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে আলোচনা শোনা থেকে শুরু করে শেষ মুহূর্তে ভ্রমণ পরিকল্পনা পরিবর্তন—এসব বিষয় তার মধ্যে অতিরিক্ত সতর্কতা তৈরি করতে পারে।
কিশোরদের মানসিক আঘাত নিয়ে কাজ করা থেরাপিস্ট আজিতা সায়ান দ্য নিউইয়র্ক পোস্টকে বলেন, ব্যারন বাস্তব বিপদ সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন, তীক্ষ্ণ ও সতর্ক হয়ে থাকতে পারেন। তবে তার মতে, অন্তর্মুখী হওয়া মানেই মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া নয়। বরং নিজের নিরাপত্তা বজায় রেখে বন্ধুত্ব ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তগুলো জনসমক্ষে না আনা তার বিকাশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
ব্যারনের বাবা-মায়ের বিভিন্ন বাসভবনেই তার জন্য আলাদা জায়গা রয়েছে। মার-আ-লাগোতে তার নিজস্ব স্যুট এবং ম্যানহাটনের মিডটাউন ট্রাম্প টাওয়ারে একটি পুরো তলা তার ব্যবহারের জন্য রয়েছে। হোয়াইট হাউসেও তার কক্ষের আসবাবপত্র ৬ ফুট ৯ ইঞ্চি উচ্চতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যারন যেখানেই থাকেন, সেখানে পৌঁছানোর পর দ্রুত ভেতরে চলে যান এবং জনসমাগমপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলেন। ট্রাম্প পরিবারের ঘনিষ্ঠ এক সূত্রের ভাষ্য, তাকে আশপাশে ঘোরাঘুরি করতে খুব একটা দেখা যায় না।
ব্যারনের জীবনধারা তার বড় ভাইবোনদের তুলনায় অনেকটাই আলাদা। ডন জুনিয়র ও এরিক ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ইভাঙ্কা ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় এবং বিভিন্ন পডকাস্টে অংশ নেন। টিফানি ট্রাম্পসহ পরিবারের অন্য সদস্যরাও নিয়মিত বাবার সঙ্গে বিভিন্ন প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন।
অন্যদিকে, বিভিন্ন সূত্রের বর্ণনায় ব্যারনকে বুদ্ধিমান ও ভদ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্প পরিবারের নামের সঙ্গে যুক্ত জনসাধারণের চাপ এবং তার বাবার ব্যক্তিত্বের মধ্যেও তিনি বিষয়গুলো ভালোভাবে সামলাচ্ছেন বলে তারা মনে করেন। পড়াশোনা শেষ করার পর ব্যারন রাজনীতির পরিবর্তে ব্যবসার দিকে এগোতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সর্বশেষ গত ১৯ জুলাই ব্যারনকে প্রকাশ্যে দেখা যায়। ফুটবলপ্রেমী ব্যারন বাবা-মায়ের সঙ্গে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখতে গিয়েছিলেন। নিরাপত্তার কারণে তারা বুলেটপ্রুফ কাচের আড়াল থেকে ম্যাচটি দেখেন।
You cannot copy content of this page