শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধ, শিক্ষক নিয়োগ, আধুনিক শিক্ষা, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন এবং শিক্ষা খাতে দুর্নীতি দমনে সরকারের পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ড. এ এন এম এহছানুল হক মিলন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।
মন্ত্রী বলেন, শিক্ষা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত। প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এ খাতে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও বাড়ানো হবে।
তৃতীয় ভাষা শিক্ষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি বাধ্যতামূলক নয়; বরং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রভিত্তিক ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি করা হবে। তবে তিনি স্বীকার করেন, বর্তমানে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রেও দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে, যা দূর করতে শিখন পদ্ধতির উন্নয়ন প্রয়োজন।
সম্প্রতি এইচএসসি প্রশ্নপত্রে ভুলের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রশ্ন প্রণয়নে এ ধরনের ভুল গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে প্রশ্নকর্তাদের আরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
প্রশ্নফাঁস প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, চলতি পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেনি। এটি নিশ্চিত করতে পরীক্ষার আগের রাতে নতুন করে প্রশ্নপত্র ছাপানোর মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার মানোন্নয়নের বিষয়ে ড. মিলন বলেন, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা পর্যালোচনা করে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। এতে শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা, ব্যবহারিক শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং কারিকুলাম আধুনিকায়নের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। তার ভাষ্য, ২০২৮ সালের দিকে কারিকুলাম আধুনিকায়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। পাশাপাশি সব পাবলিক পরীক্ষায় অভিন্ন প্রশ্নপত্র চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষক সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ না হওয়ায় দেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ৩২ হাজার শিক্ষককে পদোন্নতি দিয়ে প্রধান শিক্ষক করা হবে এবং পরবর্তীতে প্রায় ৩৮ হাজার নতুন শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া এমপিওভুক্ত, সরকারি স্কুল-কলেজ এবং কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রায় ৭৭ হাজার শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে।
অনুমোদনহীন কিন্ডারগার্টেন, স্কুল ও মাদরাসা সম্পর্কে তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানকে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালার আওতায় আনা হবে, যাতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠে এবং শিক্ষার মান নিশ্চিত করা যায়।
উচ্চশিক্ষায় গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ন্যানো প্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা ও ডিজিটাল শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়ার কথাও জানান শিক্ষামন্ত্রী। তার মতে, ভবিষ্যতের বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
শিক্ষা খাতে দুর্নীতি দমনে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে ড. মিলন বলেন, বদলি বাণিজ্য বা অনিয়মের ক্ষেত্রে সরকার 'জিরো টলারেন্স' নীতি অনুসরণ করছে এবং দায়িত্ব গ্রহণের পর কোনো বদলি বাণিজ্য হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে আনন্দময় শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াচর্চার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের বিষয়ে তিনি অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সন্তানদের শিক্ষা শুধু পরিবারের নয়, দেশের ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িত। তাই শিক্ষা কার্যক্রমে অযথা বিঘ্ন সৃষ্টি না করে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী এবং কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষার ওপরও সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
You cannot copy content of this page