জাতীয় ক্রিকেট দলের স্পিনার নাঈম হাসানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া কথিত পুলিশি হেনস্তা ও নির্যাতনের ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ক্রিকেট অঙ্গনের তারকা, ক্রীড়া সংগঠক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী এবং মূলধারার গণমাধ্যম—সকলেই এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একজন জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে নাঈমের প্রতি এমন আচরণ নিঃসন্দেহে নিন্দনীয় এবং এর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হওয়া প্রয়োজন। তবে এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আমাদের সামনে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া একই ধরনের ঘটনা কি কখনো এমন জাতীয় আলোচনার জন্ম দেয়?
বাস্তবতা হলো, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসদাচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা হয়রানির অভিযোগ নতুন নয়। প্রায়ই সংবাদপত্রের ছোট কলামে কিংবা স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিবেদনে উঠে আসে নিরীহ মানুষকে আটক, মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা মিথ্যা মামলায় জড়ানোর অভিযোগ। অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনা সংবাদমাধ্যমের নজরেই আসে না। ভুক্তভোগীরা হয়তো দরিদ্র, প্রভাবহীন কিংবা পরিচিত মুখ নন। ফলে তাদের কণ্ঠস্বর সমাজের বৃহৎ পরিসরে পৌঁছানোর সুযোগ পায় না।
নাঈম হাসানের ঘটনা আলোচনায় এসেছে মূলত তিনি একজন পরিচিত ব্যক্তি বলে। জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে তার একটি সামাজিক অবস্থান রয়েছে। তার সহকর্মী, সমর্থক এবং মিডিয়ার একটি বড় অংশ তার পাশে দাঁড়িয়েছে। এটি স্বাভাবিক এবং ইতিবাচক। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন জাগে, একজন সাধারণ শ্রমিক, কৃষক, রিকশাচালক, দোকানকর্মী কিংবা শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে যদি একই ঘটনা ঘটত, তবে কি এমন তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যেত? দুর্ভাগ্যজনকভাবে উত্তরটি প্রায়ই নেতিবাচক।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান। সংবিধানও সেই নিশ্চয়তা দেয়। একজন জাতীয় দলের ক্রিকেটার, একজন ব্যবসায়ী কিংবা একজন দিনমজুর—সবার মানবিক মর্যাদা ও আইনি অধিকার সমান হওয়া উচিত। কিন্তু সামাজিক বাস্তবতায় দেখা যায়, পরিচিতি, অর্থনৈতিক অবস্থান ও সামাজিক প্রভাবের ভিত্তিতে মানুষের প্রতি আচরণের ভিন্নতা তৈরি হয়। এই বৈষম্য কেবল প্রশাসনিক ব্যবস্থায় নয়, গণমাধ্যমের আচরণ এবং জনমতের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদমাধ্যমের কাজ শুধু আলোচিত ব্যক্তিদের খবর প্রচার করা নয়; বরং যাদের কণ্ঠস্বর দুর্বল, তাদের সমস্যাকেও সামনে নিয়ে আসা। একটি তারকা ক্রিকেটারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায় যেমন গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে, তেমনি গ্রামের একজন সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ও সমান গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য। যদি বিচার ও মানবাধিকারের প্রশ্নে আমরা ব্যক্তি পরিচয়ের ভিত্তিতে গুরুত্ব নির্ধারণ করি, তবে ন্যায়বিচারের মৌলিক ধারণাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
তবে এটিও সত্য যে নাঈম হাসানের ঘটনা একটি ইতিবাচক উপলক্ষ তৈরি করেছে। কারণ এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশি আচরণ, জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এখন প্রয়োজন এই আলোচনাকে শুধু একজন ক্রিকেটারের ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে যাওয়া। প্রশ্ন উঠতে হবে—প্রতিদিন যেসব মানুষ হয়রানি বা নির্যাতনের অভিযোগ করেন, তাদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আমরা কী করছি? তাদের অভিযোগ তদন্তের জন্য কি যথেষ্ট কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে? দায়ীদের বিরুদ্ধে কি দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করা হচ্ছে?
একটি সভ্য রাষ্ট্রের মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে প্রভাবশালী নাগরিকের সঙ্গে কেমন আচরণ করে তা দিয়ে নয়; বরং সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায় নাগরিকের অধিকার কতটা রক্ষা করতে পারে, তা দিয়ে। একজন বিখ্যাত ক্রিকেটার অন্যায়ের শিকার হলে সমাজ প্রতিবাদ করবে—এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু সেই প্রতিবাদ যদি একজন সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকে, তবে সেখানে ন্যায়বিচারের চেয়ে পরিচিতির প্রভাবই বেশি কাজ করছে বলে ধরে নিতে হবে।
নাঈম হাসানের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাদের আত্মসমালোচনাও জরুরি। আমরা কি শুধুমাত্র পরিচিত মুখদের জন্য ন্যায়বিচার চাই, নাকি প্রতিটি নাগরিকের জন্য? যদি উত্তর দ্বিতীয়টি হয়, তাহলে সমাজ, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্র—সবার দায়িত্ব হবে প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সমানভাবে সোচ্চার হওয়া।
কারণ ন্যায়বিচার তখনই সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন একজন তারকা ক্রিকেটার এবং একজন সাধারণ মানুষ—উভয়ের মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা সমান গুরুত্ব পায়। অন্যথায় বৈষম্যের যে দেয়াল আমরা ভাঙতে চাই, সেটি আরও দৃঢ় ও অদৃশ্য হয়ে আমাদের সমাজকে বিভক্ত করতেই থাকবে।
You cannot copy content of this page