চট্টগ্রামের আনোয়ারায় দীর্ঘ এক দশকের অপেক্ষা ও প্রশাসনিক জটিলতা পেরিয়ে অবশেষে বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে বহুল প্রত্যাশিত চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)। প্রায় ৭৮৩ একর জমির ওপর গড়ে উঠতে যাওয়া এ শিল্পাঞ্চলের আনুষ্ঠানিক নির্মাণকাজ ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছে গত ২৭ জুলাই। ইতোমধ্যে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সাব-লিজ চুক্তি, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার চালু এবং ৩০টির বেশি চীনা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিতে প্রকল্পটি নতুন গতি পেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আগামী ১৮ মাসের মধ্যে এ শিল্পাঞ্চলের প্রথম কারখানায় উৎপাদন শুরু হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথম পর্যায়ে ৩০টির বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নিয়মিত নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাবও আসছে। পর্যায়ক্রমে বিনিয়োগের পরিমাণ ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন জানিয়েছেন, আগামী ১৮ মাসের মধ্যে শিল্পাঞ্চলটির প্রথম কারখানায় উৎপাদন শুরু হবে। শুরুতে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটি তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে বলে ধারণা দিলেও দ্রুত কাজ শেষ করে উৎপাদনে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে জি-টু-জি সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে উঠছে বিশেষায়িত এ অর্থনৈতিক অঞ্চল। আনোয়ারার বেলচূড়া এলাকায় কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে এর অবস্থান। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম বন্দর ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় শিল্প ও লজিস্টিকসের দিক থেকে প্রকল্পটির অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চায়না ইকোনমিক জোনের সহায়ক অবকাঠামো উন্নয়নে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকার একটি প্রকল্প একনেকের অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে চীনের কাছ থেকে প্রায় ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা পাওয়ার কথা রয়েছে। বাকি অর্থ দেবে বাংলাদেশ সরকার।
প্রকল্পের আওতায় অভ্যন্তরীণ সড়ক, জেটি সংযোগ সড়ক, পানি সংরক্ষণাগার, গ্যাস সঞ্চালন অবকাঠামো, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার, বহুমুখী জেটি, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সীমানাপ্রাচীর ও বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।
এ শিল্পাঞ্চলে মূলত রপ্তানিমুখী শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। বস্ত্র ও তৈরি পোশাক, ওষুধ, হালকা প্রকৌশলসহ বিভিন্ন উৎপাদন খাতে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উচ্চপ্রযুক্তি ও কৌশলগত শিল্পেও বিনিয়োগের জন্য চীনা উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।
২৭ জুলাই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রায় ৭০ জন চীনা ব্যবসায়ী প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। এরপর থেকে নিয়মিত চীনা বিনিয়োগকারীরা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করছেন এবং বিনিয়োগের বিষয়ে যোগাযোগ করছেন।
চায়না ইকোনমিক জোন প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল ২০১৪ সালে। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময়ও প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা হয়। আনোয়ারায় জমি অধিগ্রহণের পর বেজা চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে ডেভেলপার হিসেবে নিয়ে কাজ শুরু করে। তবে ডেভেলপার চুক্তি ও ভূমি ইজারা চুক্তি সম্পন্ন না হওয়ায় প্রকল্পটি দীর্ঘদিন আটকে থাকে।
পরে ২০২২ সালে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ কর্পোরেশনকে নতুন ডেভেলপার হিসেবে সামনে আনা হয়। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রকল্পের বহিরাগত অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্ব দেওয়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রকল্প এলাকায় এরই মধ্যে প্রায় ৬০ একর জমি প্রস্তুত, সংযোগ সড়ক নির্মাণ, প্রশাসনিক ভবন স্থাপন এবং সীমিত পানি ও গ্যাস অবকাঠামোর কাজ হয়েছিল। তবে বড় ধরনের শিল্প অবকাঠামো ও কারখানা নির্মাণ শুরু না হওয়ায় দীর্ঘ সময় এলাকাটি কার্যত স্থবির ছিল।
চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের মতে, চায়না ইকোনমিক জোন বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। এটি বাংলাদেশের শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি রপ্তানি সক্ষমতা ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।
কর্ণফুলী টানেল চালুর পর দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী এলাকায় শিল্পায়নের সম্ভাবনা আরও বেড়েছে। এর সঙ্গে চায়না ইকোনমিক জোন যুক্ত হলে শিল্পকারখানার পাশাপাশি পরিবহন, গুদামজাতকরণ, আবাসন, ব্যাংকিং, বীমা, খাবার ও অন্যান্য সেবা খাতেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটির অর্থায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও ডেভেলপার নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা অনেকটাই কেটে গেছে। তবে প্রকল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের পাশাপাশি পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
চট্টগ্রাম বন্দর, কর্ণফুলী টানেল ও শাহ আমানত বিমানবন্দরের নিকটবর্তী অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে চায়না ইকোনমিক জোন ভবিষ্যতে একটি সমন্বিত শিল্প ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এতে দক্ষিণ চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
You cannot copy content of this page