নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রলোভনে রাশিয়া গিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন বাংলাদেশিরা। সম্প্রতি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেঁচে ফেরা ঝিনাইদহের তরুণ রাজন হোসেন বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, কীভাবে তাঁকে জোর করে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয় এবং ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়।
রাজনের ভাষ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে চাকরির কথা বলে ট্রাভেল এজেন্সি জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল তাঁকে রাশিয়ায় পাঠায়। সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁর পাসপোর্ট ও ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে জোরপূর্বক রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়।
রাজন জানান, মাত্র তিন সপ্তাহের অস্ত্র প্রশিক্ষণ শেষে তাঁকেসহ আরও ২৯ বাংলাদেশিকে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। তাঁর দাবি, যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় ১৭ জন বাংলাদেশি নিহত হন। পরবর্তী এক হামলায় তাঁর কোমর ও পা অবশ হয়ে যায়। চার দিন ধরে হাত ও বুকে ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি রুশ সেনা ক্যাম্পে ফিরে আসেন।
তবে ক্যাম্পে ফেরার পরও তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন রাজন। বরং অস্ত্রের বিষয়ে জানতে চেয়ে তাঁকে মারধর করা হয়। পরে তিনি জানতে পারেন, ইউক্রেনীয় সেনাদের অবস্থান শনাক্ত করতে বাংলাদেশিদের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ পুলিশের স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-১০)-এর তদন্তেও চাকরির প্রলোভনে বাংলাদেশিদের রাশিয়ায় পাঠানোর অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানান, জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিনটি এজেন্সি চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে জনপ্রতি গড়ে সাড়ে আট লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় চক্রের মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমানসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, চক্রটির সঙ্গে ইগর নামের এক রুশ নাগরিক এবং জুলিয়া নামের কিরগিজস্তানের এক নারীও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসআরবি-১০-এর তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ায় পাঠানো ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ২০ জনের নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। নিহতদের অধিকাংশই নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। উন্নত জীবনের আশায় তাঁদের অনেকে জমি কিংবা গবাদিপশু বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন।
নিহতদের স্বজনেরা এখন তাঁদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছেন। অন্যদিকে, রাশিয়ায় আটকে পড়া বাংলাদেশিদের উদ্ধার এবং নিহতদের মরদেহ দেশে ফেরানোর বিষয়ে পররাষ্ট্র ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় কাজ করছে বলে জানানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতির তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
You cannot copy content of this page