ইরানের কাছে মার্কিন একটি বিমানবাহী রণতরীতে টানা ২৫০ দিনের বেশি সময় ধরে অবস্থান করছেন হাজার হাজার মার্কিন সামরিক সদস্য। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার কারণে জাহাজে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সমস্যা এবং চরম ক্লান্তির মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে পেন্টাগনের কাছে জবাব চেয়েছেন মার্কিন আইনপ্রণেতারা। ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা ও সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তারা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপরও চাপ বাড়াচ্ছেন।
সামরিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ বিমানবাহী রণতরীর কয়েকজন নাবিক জাহাজ থেকে সাগরে লাফ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা জাহাজে থাকা স্বজনদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তবে জাহাজের পরিস্থিতি নিয়ে এসব প্রতিবেদনকে ‘সম্পূর্ণরূপে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে’ বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।
গত নভেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের উদ্দেশে যাত্রা করে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। পরে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের আগে রণতরীটিকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়। মূলত মে মাসে জাহাজটির দেশে ফেরার কথা থাকলেও কয়েক দফায় এর মোতায়েনের মেয়াদ বাড়ানো হয়। পরে ফেরার নির্দিষ্ট কোনো তারিখও ঘোষণা করা হয়নি।
তবে গত বৃহস্পতিবার একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পূর্বনির্ধারিত রোটেশন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের পরিবর্তে ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’ মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
কানেকটিকাটের সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেন্টাল প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে পাঠানো এক চিঠিতে প্রায় পাঁচ হাজার সদস্যের এই রণতরীর বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি মৌলিক সরবরাহের সংকট, পানি দূষণ, প্লাম্বিংয়ের সমস্যা, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, ডেকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং ডাক ব্যবস্থায় বিঘ্নের অভিযোগ করেন। এসব সমস্যার কারণে জাহাজে পাঠানো অনেক প্রয়োজনীয় সামগ্রী মাসের পর মাস ট্রানজিটে আটকে থাকার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ব্লুমেন্টাল বলেন, এসব প্রতিবেদন অবিলম্বে তদন্ত ও মনোযোগ দাবি করে। একই সঙ্গে নৌবাহিনী বর্তমানে বিমানবাহী রণতরীগুলোর ওপর যে ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অপারেশনাল চাপ প্রয়োগ করছে, তা টেকসই কি না—সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর রুবেন গ্যালেগো পরিস্থিতি তদন্তে মার্কিন প্রতিনিধিদলকে রণতরীতে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, রণতরীতে প্রবেশাধিকার দিতে অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই কর্মকর্তার বরাতে সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, চলতি মাসের শুরুতে এক নাবিক সমুদ্রের পানিতে পড়ে যান। পরে একটি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে তাকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে।
মিলিটারি টাইমস ও স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপসের প্রতিবেদনে পরিবারের সদস্যদের বরাতে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান ও জাহাজের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে কয়েকজন সামরিক সদস্যের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। দীর্ঘদিন বন্দরে না যাওয়া, কাপড় ধোয়ার সুযোগের সংকট এবং তাজা খাবারের সীমিত প্রাপ্যতার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এক নাবিকের আত্মীয় বিবিসিকে জানান, মোতায়েন শুরু হওয়ার পর থেকে ওই নাবিকের প্রায় ২৯ কেজি ওজন কমেছে। পরিবারের ওই সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে জাহাজের ইঞ্জিন ও বিমান ওঠানামার কারণে সৃষ্ট শব্দ ও কম্পনের মধ্যেই নাবিকদের থাকতে হচ্ছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসম্যান মাইকেল লেভিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাহাজটির বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর অভিযোগের মধ্যে ছত্রাকযুক্ত শাওয়ার, নষ্ট টয়লেট, কয়েক সপ্তাহ লন্ড্রি বন্ধ থাকা, দীর্ঘ সময় গরম পানির সংকট এবং সাবান, ডিওডোরেন্ট ও টুথপেস্টের মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতির কথা রয়েছে।
তবে মার্কিন নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা এসব অভিযোগের কিছু অংশ অস্বীকার করেছেন। বিবিসিকে তিনি জানান, জাহাজে আত্মহত্যার চিন্তা বা আত্মহত্যার চেষ্টা বেড়ে যাওয়ার কোনো তথ্য নৌবাহিনীর কাছে নেই। যুদ্ধকালীন কার্যক্রমের কারণে নিয়মিত সরবরাহব্যবস্থা কিছুটা ব্যাহত হলেও মিশন-সংক্রান্ত ও জরুরি সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাহাজে পাঠানো হচ্ছে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, জাহাজ থেকে পাওয়া সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বিশুদ্ধ পানি, সচল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং পুষ্টিকর খাবারের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত থাকার কথা বলা হয়েছে।
পানামায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও মার্কিন নৌসদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ ও কঠিন মোতায়েনের মধ্যেও নাবিকরা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে সামরিক প্রকাশনা স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপসের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের সময় নৌসদস্যদের মানসিক চাপ কমাতে বিনোদনমূলক বিভিন্ন কার্যক্রম আয়োজন করা হয়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্যান্য শাখার তুলনায় নৌবাহিনীর জাহাজে থাকা সদস্যদের মধ্যে তীব্র মানসিক সংকটের হার বেশি। গবেষণায় অনুপযুক্ত বসবাসের পরিবেশ, অতিরিক্ত শব্দ এবং পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের অভাবকে মানসিক চাপের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র: বিবিসি
You cannot copy content of this page