ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পর জলবায়ু পরিবর্তনের দায়ে বড় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশগুলোর কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে নেপাল। দেশটির দাবি, বৈশ্বিক উষ্ণায়নে বড় ভূমিকা রাখা দেশগুলোর কাছ থেকেই জলবায়ু দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য সহায়তা আসা উচিত।
বাগমতী প্রদেশের কয়েকটি জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করা ভোতেকোশি নদীর বন্যায় অন্তত ১ হাজার ১২৭ জন নিহত এবং প্রায় ৩ হাজার ৯০০ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে বিশাল পাথর ও বরফধসের কারণে এই বন্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ক্ষতিপূরণের দাবি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোরালোভাবে তুলে ধরতে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র ‘বালেন’ শাহকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে নেপাল। ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’ জানিয়েছে, শাহের নিউইয়র্ক সফরের প্রস্তাবটি বর্তমানে আলোচনায় রয়েছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নে সবচেয়ে কম অবদান রাখা দেশগুলোই যখন এর ক্ষতির শিকার হচ্ছে, তখন বড় নির্গমনকারী দেশগুলোর এসব দেশকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত।
কান্তিপুর টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের কূটনৈতিক কাঠামোকে সহায়তা থেকে ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের দিকে পরিবর্তন করছি।’
খানাল বলেন, রাসুয়ার এই দুর্যোগকে শুধু মানবিক সংকট হিসেবে দেখলে হবে না, যার জন্য দান বা সহায়তা প্রয়োজন। বড় শিল্পোন্নত অর্থনীতিগুলোর গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের কারণে যে ক্ষতি হচ্ছে, তার জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়াকে তিনি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, ‘এটি দাতব্যের বিষয় নয়; এটি আইনি ও নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়।’
খানাল চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতকে বর্তমানে বিশ্বের তিন বৃহত্তম গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশ হিসেবে উল্লেখ করে নেপালের মতো দেশকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দায়িত্ব তাদের রয়েছে বলে দাবি করেন।
তবে মোট নির্গমনের পরিমাণে ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় নির্গমনকারী হলেও দেশটির মাথাপিছু ও ঐতিহাসিক কার্বন নির্গমন উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৪ সালের EDGAR হিসাব অনুযায়ী, মোট নির্গমনের হিসাবে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বিশ্বের তিন বৃহত্তম গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশ। মাথাপিছু হিসাবে ভারতে প্রায় ৩ টন, চীনে প্রায় ১১ টন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ টনের বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂)-সমতুল্য নির্গমন হয়।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, জলবায়ু পরিবর্তনের দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক নির্গমন, মাথাপিছু নির্গমন, উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা এবং আগে শিল্পায়িত হয়ে এর সুবিধা পাওয়া দেশগুলোর অধিক দায়িত্ব বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
গত ২৬ আগস্ট ভোতেকোশি নদীর অববাহিকায় ভয়াবহ বন্যা আঘাত হানে। এতে নেপালের রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলার বিভিন্ন এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। নেপাল এই দুর্যোগকে ‘হিমালয়ান সুনামি’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং হাজারো মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
কর্তৃপক্ষ ও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল থেকেই বন্যার সূত্রপাত হয়েছে। তবে এর সুনির্দিষ্ট কারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এর সম্পর্ক কতটা, তা নিশ্চিত করতে আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।
প্রাথমিক মূল্যায়নে পাথর ও বরফধস, অস্থিতিশীল হিমবাহ এবং হিমালয়ের বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তনকে বন্যার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ভূমিকম্পপ্রবণ উচ্চ ঝুঁকির এই এলাকায় বন্যার ঘটনা ভঙ্গুর হিমালয় অঞ্চলে চীনের নির্মিত অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে গত সপ্তাহে রয়টার্সকে বলেন, বন্যায় ধ্বংস হওয়া অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে নেপালের ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। এই অর্থ দেশটির অর্থনীতির প্রায় ১০ শতাংশের সমান।
জরুরি আর্থিক সহায়তার জন্য নেপাল জাতিসংঘ-সমর্থিত ‘ফান্ড ফর রেসপন্ডিং টু লস অ্যান্ড ড্যামেজ’-এর কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে।
You cannot copy content of this page