ডারউইনের মারারারা ওভালে গত সপ্তাহে ক্রিকেট বিশ্ব দেখেছে বাংলাদেশের অবিশ্বাস্য এক জয়। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্বাগতিকদের চার দিনে ৯ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। যেকোনো বিচারে এটি বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম গৌরবোজ্জ্বল জয়।
বাংলাদেশ কোচ ফিল সিমন্সও এই জয়ের মাহাত্ম্য স্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘ ক্রিকেট ক্যারিয়ার ও আন্তর্জাতিক কোচিং জীবনে এটিই তাঁর সেরা টেস্ট জয়। তবে সেই রূপকথার গল্প এখনো শেষ হয়নি। বরং সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় পরীক্ষা।
আগামী শনিবার কুইন্সল্যান্ডের উপকূলীয় শহর ম্যাকায়ের ‘গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনা’য় শুরু হবে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট। এই ম্যাচে জয় বা ড্র করতে পারলেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবারের মতো সিরিজ জয়ের ইতিহাস গড়বে বাংলাদেশ। অন্যদিকে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ঘরের মাঠে প্রথমবার হোয়াইটওয়াশের লজ্জা এড়াতে মরিয়া থাকবে অস্ট্রেলিয়া।
অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ইতিহাসে ঘরের মাঠে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের দুটিতেই হারার নজির নেই। ডারউইনের পরাজয়ের পর সেই রেকর্ড ধরে রাখাই এখন প্যাট কামিন্সদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
প্রথম টেস্টে ব্যর্থ ওপেনার জেক ওয়েদারাল্ডকে একাদশ থেকে বাদ দিয়ে তাঁর জায়গায় ম্যাট রেনশকে নেওয়া হয়েছে। সিরিজ চলাকালে এত দ্রুত একজন খেলোয়াড়কে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত অস্ট্রেলিয়ার প্রচলিত মানসিকতার সঙ্গে খুব একটা মানানসই নয়। তবে ডারউইনের পরাজয়ও ছিল অস্ট্রেলিয়ার জন্য বেশ অস্বাভাবিক।
প্রথম টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পেরেছেন মূলত জশ হ্যাজলউড ও ক্যামেরন গ্রিন। হ্যাজলউড নিয়েছেন ছয় উইকেট, আর দ্বিতীয় ইনিংসে লড়াকু সেঞ্চুরি করেছেন গ্রিন। বাকি অজি তারকারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পারফর্ম করতে পারেননি।
ডারউইন টেস্টের অন্যতম নায়ক হাসান মাহমুদ। টেস্ট ক্যারিয়ারের শুরুতেই অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও পাকিস্তানের মাটিতে পাঁচ উইকেট নেওয়ার বিরল কীর্তি গড়েছেন তিনি। তাঁর সঙ্গে এই নজির রয়েছে ওয়েসলি হল ও অ্যান্ডি রবার্টসের।
ডারউইনে হাসানের দুর্দান্ত বোলিংয়ের সবচেয়ে বড় শিকার ছিলেন ট্র্যাভিস হেড। দুই ইনিংসেই প্রায় একই ধরনের ইনসুইঙ্গারে আউটসাইড এজ হয়ে বোল্ড হন অস্ট্রেলিয়ার এই ব্যাটার।
ফলে ম্যাকায়েতেও হাসান ও হেডের দ্বৈরথ ম্যাচের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে। হেড যদি হাসানের বোলিং সামলাতে পারেন, তাহলে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে বড় পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
ডারউইনের ঐতিহাসিক জয়ের প্রভাব পড়েছে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলেও। ম্যাকায়েতে বাংলাদেশ জয় পেলে পয়েন্ট তালিকায় আরও ওপরে উঠে আসার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে সেই লক্ষ্যে ডারউইনের পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে বাংলাদেশকে। নিখুঁত পেস বোলিং, দায়িত্বশীল ব্যাটিং এবং অধিনায়ক শান্তর কার্যকর ফিল্ডিং পরিকল্পনা আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তানজিদ হাসানের সেঞ্চুরি, মেহেদী হাসান মিরাজের অলরাউন্ড পারফরম্যান্স এবং হাসান মাহমুদের সুইং বোলিং যদি আবারও একসঙ্গে জ্বলে ওঠে, তাহলে সিরিজ জয়ের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়া বাংলাদেশের জন্য অসম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক টেস্ট ভেন্যু হিসেবে অভিষেক হতে যাওয়া ম্যাকায়ের ‘গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনা’ও রয়েছে কিছুটা রহস্যে। মাঠটিতে এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ হয়েছে।
এখানে বাতাস বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। আগের ম্যাচগুলোতে ব্যাটাররা যেমন সুবিধা পেয়েছেন, তেমনি পেস বোলাররাও বাড়তি বাউন্স ও গতি পেয়েছেন।
ইনজুরি কাটিয়ে শরীফুল ইসলাম একাদশে ফেরার জন্য প্রস্তুত। তবে ডারউইনে জয় পাওয়া পেস আক্রমণ থেকে কাকে বাদ দিয়ে তাঁকে খেলানো হবে, সেটিই এখন অধিনায়ক শান্তর জন্য এক ধরনের ‘মধুর সমস্যা’।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জিততে ভারতের ১২টি এবং পাকিস্তানের সাতটি ম্যাচ লেগেছিল। সেখানে বাংলাদেশ মাত্র তৃতীয় প্রচেষ্টাতেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় পেয়েছে।
ডারউইনের জয় তাই শুধু একটি ম্যাচের জয় নয়, বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের জন্য বড় আত্মবিশ্বাসেরও উৎস। এবার সেই আত্মবিশ্বাসকে সিরিজ জয়ে রূপ দেওয়ার পালা।
ম্যাকায়ের মাঠে বাংলাদেশ যদি আবারও নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে পারে, তাহলে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নতুন ইতিহাস লিখবে শান্তর দল। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের অপেক্ষায় এখন কোটি কোটি বাংলাদেশি ক্রিকেটপ্রেমী।
You cannot copy content of this page