ভারতের বহুল আলোচিত ‘নিট-ইউজি ২০২৬’ পুনঃপরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ভুয়া তথ্য প্রচার ঠেকাতে জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দেশটির সরকার। তবে এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন টেলিগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পাভেল দুরভ।
ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার (১৬ জুন) থেকে আগামী ২২ জুন পর্যন্ত টেলিগ্রাম ব্যবহারে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আগামী ২১ জুন অনুষ্ঠিতব্য নিট পুনঃপরীক্ষা এবং পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ‘ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি’ (এনটিএ)-এর সুপারিশে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সরকারি সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে গুগলের প্লে স্টোর থেকে টেলিগ্রাম অ্যাপ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া অ্যাপলের প্ল্যাটফর্ম থেকেও অ্যাপটি অপসারণের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।
নিষেধাজ্ঞার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রতিক্রিয়া জানান পাভেল দুরভ। তিনি বলেন, কয়েকজন ব্যবহারকারীর কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে কোটি কোটি সাধারণ ব্যবহারকারী ভোগান্তিতে পড়ছেন। তার দাবি, এ ধরনের পদক্ষেপ মূল সমস্যার সমাধান না করে বরং ভুয়া তথ্য ও প্রশ্নফাঁস-সংক্রান্ত কার্যক্রমকে অন্য প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত করতে উৎসাহিত করবে।
অন্যদিকে এনটিএ-এর মহাপরিচালক অভিষেক সিং জানিয়েছেন, এবার কোনো নির্দিষ্ট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বরং পরীক্ষা নিয়ে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্য ও গুজব পরীক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছিল। সংগঠিত জালিয়াতি চক্রের কার্যক্রম সীমিত করতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৯-এ ধারার আওতায় জারি করা নির্দেশনায় টেলিগ্রামকে আরও একটি শর্ত মানতে বলা হয়েছে। আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত ভারতে মেসেজ সম্পাদনা (এডিট) করার সুবিধা বন্ধ রাখতে হবে। এনটিএর মতে, কিছু চক্র এই ফিচার ব্যবহার করে পুরোনো বার্তা সম্পাদনা করে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র যুক্ত করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছিল।
সম্প্রতি টেলিগ্রামে ‘পেপার লিকড নিট’, ‘রি-নিট ২০২৬’ এবং ‘প্রাইভেট মাফিয়া’ নামের বিভিন্ন চ্যানেলের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ দাবি করার অভিযোগ ওঠে। এর আগে সাইবার অপরাধ দমন সংস্থা বিভিন্ন গ্রুপ ও বট অপসারণ করলেও শেষ পর্যন্ত পুরো প্ল্যাটফর্মে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, গত ৩ মে অনুষ্ঠিত মূল নিট-ইউজি পরীক্ষা অনিয়মের অভিযোগে বাতিল করা হয়েছিল। সেই পরীক্ষার পুনঃআয়োজন করা হচ্ছে আগামী ২১ জুন।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ভারতে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে। ডিজিটাল অধিকারবিষয়ক সংগঠন ‘ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন’ (আইএফএফ) একে ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ ও ‘অকার্যকর’ পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেছে।
এদিকে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ নিসর্গ অধিকারীর মতে, টেলিগ্রামকে পুরোপুরি বন্ধ করা বাস্তবে কঠিন। প্রক্সি বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত উপায়ে ব্যবহারকারীরা অ্যাপটি ব্যবহার চালিয়ে যেতে পারবেন।
তবে সিদ্ধান্তের পক্ষে মত দিয়েছেন কিছু বিশেষজ্ঞ। তাদের মতে, টেলিগ্রামের মেসেজ সম্পাদনা সুবিধার অপব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো সম্ভব, যা পরীক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
অন্যদিকে শিক্ষার্থী ও অধিকারকর্মীদের একটি অংশ প্রশ্ন তুলেছে, ভুয়া তথ্যের অজুহাতে পুরো একটি যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া কতটা যৌক্তিক। তাদের মতে, সমস্যার মূল উৎস শনাক্ত ও দমন করাই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
You cannot copy content of this page