বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মীকে জাপানে নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করতে চায় বাংলাদেশ।
গতকাল রোববার (১১ জানুয়ারি) ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় জাপানের সাবেক ফার্স্ট লেডি আকিয়ে আবে ও জাপানি উদ্যোক্তাদের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে এসব কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা।
সাক্ষাতে আকিয়ে আবে বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য অধ্যাপক ইউনূসের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বৈঠকে বিনিয়োগ, সামুদ্রিক গবেষণা, জাপানে পরিচর্যাকারী ও নার্স নিয়োগসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে জাপানে এসব পেশায় দক্ষ জনবলের চাহিদা বাড়ছে বলেও আলোচনায় উঠে আসে।
সামুদ্রিক দূষণ রোধে যৌথ উদ্যোগের বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন আকিয়ে আবে। তিনি বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরে যেন আবর্জনা না ফেলা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে চাই।’ একই সঙ্গে তিনি সমুদ্র দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে বড় পরিসরে প্রচারণার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
প্রধান উপদেষ্টা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব শেষ করার পর আগামী মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে তিনি টোকিও সফরের পরিকল্পনা করছেন। এ সফরে তিনি জাপানের খ্যাতনামা সাসাকাওয়া ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যৌথ সামুদ্রিক গবেষণা উদ্যোগে অংশ নেবেন। তাঁর আমন্ত্রণে সাসাকাওয়া ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম উপকূলে মহেশখালী-মাতারবাড়ী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের পরিকল্পনাও করেছে। এই চুক্তির আওতায় উপকূলীয় এলাকায় তিনটি আদর্শ মৎস্যগ্রাম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, জাপানে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে হাজার হাজার নার্স ও কেয়ারগিভারকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। পাশাপাশি জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে অন্তত এক লাখ বাংলাদেশি কর্মীকে জাপানে পাঠাতে জাপানি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। এই সংখ্যা আরও বাড়াতে জাপানি পক্ষের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
বৈঠকে জাপানের শীর্ষ বায়োফুয়েল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইউগ্লেনার প্রতিষ্ঠাতা মিৎসুরু ইজুমো সামাজিক ব্যবসাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগে সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। নির্বাচন শেষে তিনি তাঁর আগের কাজে ফিরে যাবেন বলেও জানান।
তিনি পুনরায় স্পষ্ট করেন, ভবিষ্যতে রাজনীতিতে যোগ দেওয়া কিংবা কোনো সরকারি বা রাষ্ট্রীয় পদে থাকার কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই। বরং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং ‘থ্রি জিরো’—শূন্য বেকারত্ব, শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ ও শূন্য সম্পদ কেন্দ্রীকরণ—এই ধারণা বাস্তবায়নেই তিনি কাজ করতে চান।
বৈঠকে এসডিজি সমন্বয়ক ও জ্যেষ্ঠ সচিব লামিয়া মোরশেদ উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, এর আগেও জাপানের সঙ্গে বিনিয়োগ, মানবিক সহায়তা, যুব উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়ে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ–জাপান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও গভীর ও বহুমুখী হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয়