ইরানে চলমান বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছে দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি হুঁশিয়ার করে ইরান জানিয়েছে, এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নিলে শুধু ইরান নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শুক্রবার (২ জানুয়ারি) ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান আলি লারিজানি এক বিবৃতিতে বলেন, ট্রাম্পের জানা উচিত—ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার শামিল হবে এবং এর পরিণতি আমেরিকার জন্যও ভয়াবহ হতে পারে।
এর আগে একই দিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে হুমকি দেন। তিনি লেখেন, ইরানে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর যদি নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালায় বা সহিংসভাবে দমন করা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘উদ্ধারে’ এগিয়ে আসবে। ট্রাম্প আরও বলেন, “আমরা পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানায় তেহরান। ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা আলি শামখানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, “ইরানের মানুষ আমেরিকানদের ‘বাঁচানোর’ অভিজ্ঞতা ভালোভাবেই জানে—ইরাক, আফগানিস্তান থেকে শুরু করে গাজা পর্যন্ত।”
তিনি আরও হুঁশিয়ার করে বলেন, “যে হাত হস্তক্ষেপের অজুহাতে ইরানের নিরাপত্তার কাছে আসবে, তা পৌঁছানোর আগেই অনুশোচনামূলক জবাব দিয়ে কেটে ফেলা হবে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা একটি লাল রেখা—এটা কোনো দুঃসাহসী টুইটের বিষয় নয়।”
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাইও যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি এক্সে লিখেছেন, আমেরিকা ইরানের মানুষের জন্য যে দুঃখপ্রকাশের কথা বলছে, তা অতীতে ইরানিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৫৩ সালে ড. মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের নির্বাচিত সরকার উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা, ১৯৮৮ সালে ইরানের যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করে নারী-শিশুসহ যাত্রীদের হত্যা এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেনকে সর্বাত্মক সমর্থনের ইতিহাস রয়েছে। এসবের পর এখন ইরানিদের জন্য দুঃখপ্রকাশের অজুহাতে হস্তক্ষেপের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ইসমাইল বাকাই জোর দিয়ে বলেন, ইরানের জনগণ নিজেদের মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান করবে; কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের সুযোগ দেওয়া হবে না।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এসব বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, চলমান বিক্ষোভে অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া ইরানের আধা-সরকারি ফার্স সংবাদ সংস্থা ও মানবাধিকার সংস্থা হেঙ্গাওর তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে ছয়জন নিহত হন। এর মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লোরদেগান শহরে দুজন, আজনায় তিনজন এবং কুহদাশ্ত শহরে একজন নিহত হয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের মন্তব্য এবং তার জবাবে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কড়া হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।