হাসির উপকরণ, ব্যাকরণ, উপাদান—সবকিছুই চারপাশে ছড়িয়ে আছে। তবুও আমরা যারা হাসি না, তাদের যেন আলাদা করে চিহ্নিত করে নির্বাসনে পাঠানো উচিত—এমনটাই যেন কখনো কখনো মনে হয়। জোর করে হাসিকে উপেক্ষা করা স্বাধীন সমাজে সত্যিই এক ধরনের দুঃসাহস।
‘হাসি’, ‘খুশি’, ‘সুখী’—এই শব্দগুলো ছোটবেলা থেকেই আমাদের কাছে মধুর লাগে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা অনেকেই হাসি-খুশির ভান করি; সত্যিকারের মন থেকে হাসি না। হাসতে ভালোও বাসি না অনেক সময়।
আমরা যারা হাসি না, তারা কি ফেসবুক ব্যবহার করি না? পত্রিকা পড়ি না? দখল হওয়া ফুটপাতে জায়গা না পেয়ে মূল রাস্তায় ঝুঁকি নিয়ে হাঁটি না? বাসে সিট না পেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝুলে থাকি না? সন্ধ্যা-রাতভর মশার যন্ত্রণা সহ্য করি না? সবই করি। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—কেন আমরা হাসি না?
আসলে আমরা যারা হাসি না, তারা যেন একধরনের ‘অসুখী মানুষ’। অথচ চারপাশে সুখ-হাসির এত আয়োজন থাকা সত্ত্বেও আমরা ভেতর থেকে হাসতে পারি না। অনেক সময় হাসি হয়ে যায় দায়িত্ব, অভ্যাস, বা সামাজিক ভান।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে হাসির রূপও বদলে গেছে। এখন মানুষ বাস্তবের চেয়ে বেশি হাসে অনলাইনে। ক্যামেরার সামনে হাসি থাকে, কিন্তু ক্যামেরা সরে গেলে সেই হাসিও হারিয়ে যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা হাসি দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাই, এমনকি দুঃখের খবরেও কখনো কখনো ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট চলে আসে।
হাসি এখন আর কেবল অনুভূতি নয়, অনেক ক্ষেত্রে এটি সামাজিক পরিচয়ের অংশ। কার কতটা হাসি, কতটা উপস্থিতি—তা অনেক সময় অনলাইন ‘রিচ’-এর সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়।
তবুও হাসির একটি গভীর দিক আছে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ হাসি-কান্নার মধ্য দিয়েই জীবন পার করে। সুখ-দুঃখের এই দোলায় চলতে চলতে জীবন এগিয়ে যায় নিজের গতিতে।
হাসির ইতিহাসে সমাজও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একসময় টিভি বা মঞ্চের হাস্যরস মানুষকে একসঙ্গে হাসাত। এখন সেই জায়গা অনেকটাই দখল করেছে সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্ট ও ট্রল সংস্কৃতি। হাসির মানে কখনো কখনো কেবল ‘ভাইরাল হওয়া’।
আবার অফিস-রাজনীতি, সামাজিক সম্পর্ক—সবখানেই হাসি এক ধরনের ‘দায়িত্বে’ পরিণত হয়েছে। বসের কৌতুকেও হাসতে হয়, পরিস্থিতি সামলাতে হাসতে হয়, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হাসতে হয়। ফলে অনেক সময় হাসি হয়ে যায় প্রাকৃতিক নয়, বরং কৃত্রিম।
তবুও হাসির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। হাসি শরীর ও মনের জন্য উপকারী, চাপ কমায়, সম্পর্ক সহজ করে। তাই হাসি কখনো কখনো শুধু আনন্দ নয়, একটি প্রয়োজনও।
জীবনের ব্যস্ততা, চাপ ও বাস্তবতার মধ্যেও হাসি হারিয়ে ফেলা উচিত নয়। কারণ হাসি শুধু মুখের অভিব্যক্তি নয়, এটি মানুষের মানসিক অবস্থারও প্রতিফলন।
You cannot copy content of this page