নামে গাজীপুর সদর উপজেলা থাকলেও এর নিজস্ব সীমানার মধ্যে নেই উপজেলা পরিষদ কার্যালয় কিংবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ফলে প্রশাসনিক ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা পেতে উপজেলার চারটি ইউনিয়নের প্রায় আট লাখ বাসিন্দাকে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।
বর্তমান গাজীপুর সদর উপজেলা ভাওয়ালগড়, পিরুজালী, মির্জাপুর ও বাড়িয়া—এই চারটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। তবে উপজেলা পরিষদের কার্যক্রম এখনো গাজীপুর মহানগরের ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের ডুয়েট এলাকায় অবস্থিত পুরোনো কার্যালয় থেকেই পরিচালিত হচ্ছে, যা বর্তমান উপজেলা সীমানার বাইরে।
একইভাবে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়, উপজেলা শিক্ষা অফিস, নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়সহ অধিকাংশ সরকারি দপ্তরও মহানগর এলাকায় অবস্থিত। ফলে সাধারণ মানুষকে জন্ম নিবন্ধন, ভূমি সংক্রান্ত কাজসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবা নিতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সংকট রয়েছে। উপজেলায় কয়েকটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও এখনো কোনো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। এতে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে স্থানীয়দের অন্য উপজেলায় বা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।
জানা গেছে, ২০১৩ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশন গঠনের আগে গাজীপুর সদর উপজেলা দেশের অন্যতম বৃহৎ উপজেলা ছিল। পরে সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর উপজেলার সীমানা পুনর্গঠন করা হয়। মির্জাপুর ইউনিয়নকে ভাগ করে তিনটি ইউনিয়ন এবং বাড়িয়া ইউনিয়ন নিয়ে বর্তমান সদর উপজেলা গঠন করা হলেও এক দশকের বেশি সময়েও নিজস্ব প্রশাসনিক কমপ্লেক্স ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়নি।
ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, সরকারি অফিসে যেতে অনেক সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে অনেকেই শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বাধ্য হন।
শিরিরচালা এলাকার বাসিন্দা সুমন হায়দার জানান, জন্ম নিবন্ধনের মতো সাধারণ কাজের জন্যও প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে যেতে হয়, যা সাধারণ মানুষের জন্য কষ্টসাধ্য।
মির্জাপুর গ্রামের সানোয়ার হোসেন বলেন, তাদের এলাকা থেকে উপজেলা কার্যালয়ের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়রা এ সমস্যার সমাধান প্রত্যাশা করলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
গাজীপুর সদর উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, উপজেলা থাকলেও এর নিজস্ব এলাকায় কোনো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর নেই। এতে সাধারণ মানুষের সময় ও যাতায়াত ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে গাজীপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, উপজেলা কার্যালয়টি সিটি করপোরেশন গঠনের আগেই বর্তমান স্থানে ছিল। পরে প্রশাসনিক সীমানা পরিবর্তনের কারণে এটি সিটি এলাকার মধ্যে পড়ে যায়। এতে স্থানীয় জনগণের কিছুটা ভোগান্তি হচ্ছে এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
গাজীপুর জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, বিষয়টি নতুন নয়। উপজেলা কার্যালয় স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হবে এবং সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে প্রশাসন কাজ করছে।
গাজীপুর-আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু জানান, গাজীপুর সদর উপজেলার নিজস্ব সীমানায় উপজেলা প্রশাসনিক কমপ্লেক্স ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ইতোমধ্যে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে দীর্ঘদিনের এ সমস্যার সমাধান হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শিল্পসমৃদ্ধ এ জনপদের বিপুল জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত নিজস্ব সীমানায় উপজেলা প্রশাসনিক কমপ্লেক্স ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্থাপন করা হবে। এতে নাগরিকরা নিজ এলাকাতেই সহজে সরকারি প্রশাসনিক ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
You cannot copy content of this page