ইরানে চলমান যুদ্ধ, বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং তীব্র দাবদাহের কারণে দেশজুড়ে ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে নিয়মিত লোডশেডিং জনজীবন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিল্প উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি যুক্ত হওয়ায় সংকট আরও গভীর হয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানী তেহরানের সাবওয়ে ট্রেনে বসে শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির দুই শিক্ষার্থী কামরান ও মঈন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও দেখছিলেন। ভিডিওতে দেখা যায়, দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ১৮০ কেজি আইসক্রিম গলে যাওয়ায় এক বিক্রেতা হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তাদের কাছে এই দৃশ্য যেন বর্তমান ইরানের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
২২ বছর বয়সী কামরান জানান, সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইনাল পরীক্ষার সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সার্ভার বন্ধ হয়ে পড়ে এবং অনলাইন পরীক্ষার প্ল্যাটফর্ম অচল হয়ে যায়। ফলে ৩৮টি বিষয়ের পরীক্ষা আগামী মাস পর্যন্ত স্থগিত করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
তিনি বলেন, "এই লোডশেডিং আমাদের সব পরিকল্পনা ওলটপালট করে দিচ্ছে। সারা রাত পড়ে থেকেও সকালে জানতে হয়, বিদ্যুৎ না থাকায় পরীক্ষা বাতিল হয়েছে।"
২৪ বছর বয়সী মঈনের মতে, এই সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যসেবায়। তার ভাষায়, "যারা ভেন্টিলেটরের ওপর নির্ভরশীল বা জীবনরক্ষাকারী ওষুধ রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করেন, তাদের জন্য বিদ্যুৎ চলে যাওয়া জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।"
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং জ্বালানিমন্ত্রী আব্বাস আলিয়াবাদি গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ বিভ্রাট না হওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তবে তীব্র গরম এবং সাম্প্রতিক সামরিক হামলার পর সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় পূর্বঘোষণা ছাড়াই নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে।
তেহরান সিটি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মেহদি চামরান বলেন, সাম্প্রতিক হামলায় একাধিক বিদ্যুৎ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ইরানের জাতীয় বিদ্যুৎ কোম্পানির প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ আল্লাহদাদ জানিয়েছেন, হামলার কারণে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সক্ষমতা প্রায় ৪ হাজার ২০০ মেগাওয়াট কমে গেছে এবং দুই হাজারের বেশি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা এবং বন্দর আব্বাস, জাস্ক ও চাবাহারের বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। তীব্র দাবদাহের কারণে যান্ত্রিক ত্রুটিও বেড়েছে।
তেহরানজুড়ে ছোট ব্যবসায়ীরা পচনশীল পণ্য রক্ষায় জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছেন। অনেক ডিজিটাল বিলবোর্ড বন্ধ রয়েছে। ট্রাফিক লাইট বিকল হয়ে যাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পুলিশ সদস্যদের হাতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। তবে হাসপাতালগুলো ব্যাকআপ বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে আইসিইউসহ জরুরি সেবা সচল রাখার চেষ্টা করছে।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা বাহমান আরমান বলেন, যুদ্ধের পর ইরানের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান মোবারাকেহ স্টিল কোম্পানি ও খুজেস্তান স্টিল বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধ করলেও বিদ্যুৎ ঘাটতি কমেনি। কারণ আগে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহকারী মাহশাহর পেট্রোকেমিকেল কমপ্লেক্স হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এখন নিজেই জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল।
তার মতে, সংকটের মূল কারণ শুধু যুদ্ধ নয়; দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব, পুরোনো সঞ্চালন লাইন এবং নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ধীরগতিও সমানভাবে দায়ী।
আরমান বলেন, বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আধুনিকায়নই স্বল্পমেয়াদি সমাধান। আর দীর্ঘমেয়াদে নতুন বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা সম্পন্ন হতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
এদিকে ইরান চেম্বার অব কমার্স, ইন্ডাস্ট্রিজ, মাইনস অ্যান্ড এগ্রিকালচারের সাবেক প্রধান হোসেন সেলাহভারজি সতর্ক করে বলেছেন, শিল্পাঞ্চলগুলো প্রতিদিন চার থেকে ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকছে। এর ফলে উৎপাদন কমছে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে এবং শিল্প খাত বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের ক্ষতি, পুরোনো বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের সংকট মিলিয়ে ইরানের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বর্তমানে চরম চাপের মুখে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এই সংকট দেশটির অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
You cannot copy content of this page