রাজধানীর প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণের আলোচনা দীর্ঘদিনের। যানজট, সড়ক দুর্ঘটনা, উল্টো পথে চলাচল, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামার মতো নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ, সিটি করপোরেশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিকবার এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নীতিগতভাবে প্রধান সড়ক থেকে এসব যান সরানোর বিষয়ে সম্মতিও রয়েছে।
তবে বাস্তবে রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কগুলোতে এখনও অবাধে চলাচল করছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এতে প্রশ্ন উঠেছে—নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলেও বাস্তবায়ন কেন সম্ভব হচ্ছে না?
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ ও সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, সম্প্রতি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রধান সড়কে অটোরিকশা চলাচল বন্ধ বা সীমিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সরকারি নির্দেশনা জারি হয়নি।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে অনুমোদন মিললে প্রথম ধাপে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো থেকে অটোরিকশা সরিয়ে দেওয়া হবে। পরে পর্যায়ক্রমে পুরো রাজধানীতে এসব যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সঠিক সংখ্যা সরকারের কাছেও নেই। তবে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর এক সমীক্ষায় দেশে প্রায় ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশ দেশেই তৈরি হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
খাত-সংশ্লিষ্টদের ধারণা, শুধু রাজধানী ঢাকাতেই ১৫ থেকে ২০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে।
ট্রাফিক বিভাগ বলছে, প্রধান সড়কে ধীরগতির অটোরিকশা চলাচলের কারণে যানজট বাড়ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে এসব যান নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি বড় প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।
সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
ট্রাফিক কর্মকর্তাদের মতে, নিয়মিত অভিযান চালিয়েও সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য সমন্বিত প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, অটোরিকশার কারণে সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। অনেক চালক উল্টো পথে চলাচল করেন এবং হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে যাত্রী ওঠানামা করান।
তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও সিটি করপোরেশন এখনও কোনো লিখিত নির্দেশনা পায়নি। এছাড়া অটোরিকশাগুলো নিবন্ধনবিহীন হওয়ায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণেও জটিলতা রয়েছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিসুর রহমান জানান, সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
তিনি বলেন, সিদ্ধান্ত হলে প্রধান সড়ক থেকে অটোরিকশা সরিয়ে দেওয়া হবে। বর্তমানে ট্রাফিক বিভাগ প্রতিদিন অভিযান পরিচালনা করছে এবং দৈনিক পাঁচ শতাধিক অটোরিকশা জব্দ করে ডাম্পিংয়ে পাঠানো হচ্ছে।
তবে তিনি স্বীকার করেন, জনবল ও ডাম্পিং সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে শতভাগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, শুধু প্রধান সড়কে অটোরিকশা নিষিদ্ধ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
তার মতে, এসব যানকে নিবন্ধন, লাইসেন্স, কারিগরি মানদণ্ড এবং জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। চালক ও যান শনাক্তে কিউআর কোড বা ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও অনেক অটোরিকশা এখনও মহাসড়ক ও প্রধান সড়কে চলাচল করছে। তাই সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
ড. হাদিউজ্জামানের মতে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবৈধ চার্জিংয়ের কারণে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ সংযোগ ও বিদ্যুৎ চুরির মাধ্যমে এসব যান চার্জ দেওয়া হয়, ফলে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি—
সংশ্লিষ্টদের মতে, সমন্বিত নীতিমালা ও কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া রাজধানীর প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল বন্ধ করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে যানজট ও দুর্ঘটনা কমাতেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
You cannot copy content of this page