বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো বিদেশ সফর করছেন। সোমবার (২২ জুন) মালয়েশিয়ায় ১৮ ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত সফর শেষে তিনি চীনের দালিয়ানে পৌঁছান।
সফরসূচি অনুযায়ী, বুধবার (২৪ জুন) দুপুরে তিনি হাইস্পিড ট্রেনে দালিয়ান থেকে বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। বেইজিং সফর থেকেই মূল চীন কর্মসূচি শুরু হবে বলে জানা গেছে।
সফরে চীনের সঙ্গে ১৫ থেকে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি অ্যাকশন প্ল্যান এবং একটি প্রটোকল অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
চীন সফরের আলোচনায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে থাকছে সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা। এই প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনা ও পরিকল্পনা এবার নতুনভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তিস্তা নদীর বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৪ সাল থেকে ভারতীয় নদী প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের কারণে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা প্রায় শুকিয়ে যায়, ফলে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে রংপুর বিভাগের একাধিক উপজেলা দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন ও পানির সংকটে রয়েছে।
প্রস্তাবিত তিস্তা মহাপরিকল্পনায় নদী খনন, তীর সংরক্ষণ, চর উন্নয়ন এবং দুই পাড়ে পরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে আধুনিক স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনায় ১০৮ কিলোমিটার নদী খনন, ১৭৩ কিলোমিটার তীররক্ষা এবং কৃষিজমি পুনরুদ্ধারের মতো বড় অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলে সারা বছর নৌচলাচল, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রায় ৭ থেকে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চীনের হোয়াংহো নদী ব্যবস্থাপনার উদাহরণ টেনে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিক নদী শাসনের মাধ্যমে তিস্তার মতো নদীকেও উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও চীনের পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন অব চায়নার মধ্যে ২০১৬ সালে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়টি আরও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আল সিয়াম জানান, চীনের সঙ্গে নদী ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, জ্বালানি, শিল্প স্থানান্তর, অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিমান যোগাযোগ এবং অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিস্তৃত ইস্যুতে আলোচনা হবে।
তিনি আরও বলেন, তিস্তা, পদ্মা ও অন্যান্য নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমন্বিত আলোচনা হবে এবং বাংলাদেশ বিষয়টি বৈঠকে উপস্থাপন করবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আলোচ্য এজেন্ডায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট আরসিইপি, ব্রিকস ও সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনে (এসসিও) বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নীলফামারীতে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী হাসপাতাল নির্মাণ এবং মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নসহ একাধিক বড় অবকাঠামো প্রকল্পেও চীনের অর্থায়ন বা সহযোগিতা আসতে পারে।
এছাড়া চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে সরাসরি বিমান যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা শিল্প স্থানান্তরের বিষয়গুলোও আলোচনায় গুরুত্ব পাবে বলে জানা গেছে।
চীন সফরকে বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে দুই দেশের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
You cannot copy content of this page