1. dsdc.mostafiz@gmail.com : mrahman :
  2. live@www.media71bd.com : Media 71 : Media 71
  3. info@www.media71bd.com : Media 71 :
সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩০ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষঃ
কানাডার সামরিক প্রশিক্ষণ ঘাঁটিতে আগুন, নিহত ৪ সেনাসদস্য, আহত ৩৯ সাংবাদিক আলিফ হত্যার প্রতিবাদে পূর্বধলায় মানববন্ধন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি সাতক্ষীরা সীমান্তে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা : দুর্গাপূজায় ১৬ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন পূর্বধলার গোহালাকান্দায় পূজা মণ্ডপ পরিদর্শনে ইউএনও-ওসি-পুলিশ প্রশাসন ইশরাকের পদত্যাগের খবর ভিত্তিহীন, দাবি প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরের ইশরাকের পিস্তল উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযান, শপথ ভঙ্গের অভিযোগ জামায়াতের কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুনে ১০ মৃত্যু: সতর্কবার্তা ও জরিমানার পরও চলছিল কার্যক্রম দাদার মৃত্যুর পর এতিম নাতি-নাতনির দায়িত্ব কার? ইসলামে যা বলা হয়েছে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশের খবর গুজব, দাবি প্রতিমন্ত্রীর ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশের গুঞ্জন, দাবি নাকচ করলেন প্রতিমন্ত্রী

কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুনে ১০ মৃত্যু: সতর্কবার্তা ও জরিমানার পরও চলছিল কার্যক্রম

লিমন, স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম
  • প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় অগ্নিনিরাপত্তা, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ফায়ার সার্ভিসের সতর্কবার্তা, পরিবেশ অধিদপ্তরের বন্ধের নোটিশ ও জরিমানা এবং কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের স্থাপনা অপসারণের নোটিশের তথ্য সামনে আসার পরও কীভাবে রিসোর্টটির কার্যক্রম চলছিল, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

মানুষ অবকাশযাপনে যায় স্বস্তি ও আনন্দের খোঁজে। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে কিংবা সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে কেউ যেন প্রাণ না হারান, সেটিই প্রত্যাশা। কিন্তু ইনানীর টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু সেই আনন্দকে শোক ও বেদনায় পরিণত করেছে।

ঘটনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, আগেই ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করা হয়ে থাকলে নিরাপত্তার ঘাটতি দূর করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল? প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি প্রশাসনিক পদক্ষেপের ধারাবাহিক পর্যালোচনাও জরুরি।

গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। কাঠের তৈরি স্থাপনার বড় অংশে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে সকাল ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তারের তত্ত্বাবধানে প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ততক্ষণে ১০ জনের মৃত্যু হয়। ঘটনায় অন্তত ছয়জন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন থাকতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে প্রশাসন। তাঁদের পরিচয় ও পারিবারিক সম্পর্ক নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন ইউএনও পান্না আক্তার।

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, গত জুন মাসে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, পরিদর্শনের পর প্রতিষ্ঠানটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে ১১ জুন নোটিশ দেওয়া হয়।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুয়াইদ ১৭ অক্টোবর ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, রিসোর্টটির ফায়ার সেফটি লাইসেন্স ছিল না।

ইউএনও পান্না আক্তারের ভাষ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটির বড় অংশ কাঠের তৈরি হওয়ায় সমুদ্রের বাতাসে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেতব্যবস্থা, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনার মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার ঘাটতি ছিল। রিসোর্টটি মাত্র সাত থেকে আট মাস আগে নির্মিত হয়েছিল বলেও তিনি জানান।

এসব তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে, ঝুঁকি শনাক্ত করার পর রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার ঘাটতি দূর করেছিল কি না। সংশ্লিষ্ট দপ্তর পুনরায় পরিদর্শন করেছিল কি না এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় কার্যক্রম বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

কোনো স্থাপনাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিশ দেওয়াই যথেষ্ট নয়। সতর্কবার্তার পর ঝুঁকি কমেছে কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি।

টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টের পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানিয়েছেন, ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় এ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ছাড়পত্রের জন্য আবেদনও করেনি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার অঞ্চলের পরিচালক জমির উদ্দিন জানান, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা করায় গত এপ্রিলে টুপটুপ রেস্টুরেন্টকে বন্ধের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। নির্দেশনা না মানায় পরের মাসের ১৩ তারিখ প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবেশগত ছাড়পত্র পেতে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত ভবন নকশা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট থাকা প্রয়োজন। টুপটুপ রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের কোনোটিই ছিল না বলে তিনি জানান।

এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বন্ধের নোটিশ ও জরিমানার পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম অব্যাহত থাকার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কীভাবে মোকাবিলা করেছিল। জরিমানার পর পুনরায় পরিদর্শন করা হয়েছিল কি না, আইনগতভাবে পরবর্তী কী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন এলাকায় ছাড়পত্র ছাড়া রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্ট পরিচালনার অভিযোগে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে বিভিন্ন সময়ে আরও ২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্টুরেন্টকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। নির্দেশনা অমান্য করায় ১৪টি রিসোর্টকে জরিমানা করা হয় এবং দুটি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। বাকি ১০টি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হলেও তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ১৯৯৯ সালে মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন সৈকত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। ওই এলাকায় টুপটুপসহ একাধিক রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধের উদ্যোগ নিতে গিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন বলেও তাঁদের দাবি। অভিযোগটির সত্যতা ও প্রভাব নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় ৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে বিপুলসংখ্যক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. জসিম উদ্দিন জানিয়েছেন, তাঁদের তালিকায় দোকানপাটসহ প্রায় ১৫০টি অবৈধ হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে।

তিনি বলেন, টুপটুপ রেস্টুরেন্টকে এর আগে দুই দফায় স্থাপনা ভেঙে ফেলার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির কোনো অনুমোদন ছিল না বলেও তিনি জানান। আগামী সপ্তাহ থেকে অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

প্রায় ১৫০টি অবৈধ স্থাপনার তালিকা থাকার পরও সেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে কী বাধা ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদন, স্থাপনার বৈধতা এবং আইন প্রয়োগের অগ্রগতি প্রকাশ করা হলে পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পরিবেশ আইনে নোটিশ ও জরিমানা করার সুযোগ থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা উচ্ছেদ করার এখতিয়ার তাঁদের নেই। এ ক্ষেত্রে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আইনি ক্ষমতা রয়েছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন।

বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব ও ক্ষমতার এই বিভাজনের কারণে কার্যকর সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি দপ্তর অনিয়ম শনাক্ত করার পর অন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা কীভাবে ব্যবস্থা নেবে, তা নিশ্চিত করার কার্যকর প্রক্রিয়া না থাকলে আইন প্রয়োগ কাগজপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি থাকে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে আগুনের সূত্রপাত, দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণ, অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থার অবস্থা এবং প্রাণহানির পেছনে কোনো অবহেলা বা নিরাপত্তাগত ঘাটতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

পাশাপাশি স্থাপনাটির নির্মাণ ও ব্যবহারসংক্রান্ত অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র, ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং আগের নোটিশের পর গৃহীত পদক্ষেপের নথি পর্যালোচনা করা জরুরি।

জালিয়া পালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এসএম সৈয়দ আলম জানিয়েছেন, জায়গাটির মালিকানা নিয়ে বিরোধ ছিল। ফলে জমির মালিকানা, রিসোর্ট পরিচালনার অধিকার এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার ওপর ছিল, তা-ও নির্ধারণ করতে হবে।

ঘটনায় রিসোর্টের মালিক তানভীর আহমদকে প্রধান আসামি করে উখিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে। পুলিশ হেফাজতে থাকা রিসোর্টের ম্যানেজার সুমনকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলে প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান জানিয়েছেন, তদন্ত ছাড়া অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের পরই এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।

তদন্তে রিসোর্টের মালিক ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকার পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের পদক্ষেপও যাচাই করা প্রয়োজন। পূর্ববর্তী সতর্কবার্তা সম্পর্কে তাঁরা অবগত ছিলেন কি না, তাঁদের আইনগত দায়িত্ব কী ছিল এবং দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলা হয়েছিল কি না, তা নথিপত্র ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ১২ ধারায় প্রযোজ্য প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে টুপটুপ রিসোর্টের ক্ষেত্রে ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক ছিল কি না, তা সংশ্লিষ্ট বিধিমালা, প্রতিষ্ঠানের শ্রেণি ও নথিপত্র যাচাই করে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ আইন, ২০১৪-তে নিবন্ধন ও লাইসেন্সসংক্রান্ত বিধান রয়েছে। একইভাবে, অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন, ২০০৩ অনুযায়ী রিসোর্টটির নির্মাণ, নকশা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী ধরনের অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ও অনুমোদন প্রয়োজন ছিল, তা যাচাই করা জরুরি।

দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩০৪ক ধারায় অবহেলাজনিত কাজের কারণে মৃত্যু ঘটলে শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই বিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাঁর দায়িত্ব, কাজ বা অবহেলা এবং মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।

টুপটুপ রিসোর্টে ১০ পর্যটকের মৃত্যু অগ্নিনিরাপত্তা, আইন প্রয়োগ ও প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে। ফায়ার সার্ভিসের সতর্কবার্তা, পরিবেশ অধিদপ্তরের বন্ধের নোটিশ ও জরিমানা এবং কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের স্থাপনা অপসারণের নোটিশের তথ্য সঠিক হলে, এসব পদক্ষেপের পরও কার্যক্রম কীভাবে অব্যাহত ছিল, তা অনুসন্ধান করা জরুরি।

তদন্তে ফায়ার সার্ভিসের সতর্কবার্তার পর পুনরায় পরিদর্শন হয়েছিল কি না, অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি দূর না হওয়ায় কার্যক্রম বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না, পরিবেশ অধিদপ্তরের নোটিশ ও জরিমানার পর অন্য সংস্থাগুলোকে জানানো হয়েছিল কি না এবং স্থাপনা অপসারণের নোটিশ বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণ কী—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।

তবে তদন্তের আগেই কোনো ব্যক্তি বা দপ্তরকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করা সমীচীন নয়। সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের আইনগত দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, জানা তথ্য এবং গৃহীত বা গৃহীত না হওয়া পদক্ষেপের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করতে হবে। প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা থাকলে তা মোকাবিলায় কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেটিও পর্যালোচনায় আসা প্রয়োজন।

টুপটুপ রিসোর্টে ১০ পর্যটকের মৃত্যু শুধু একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নয়; এটি পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপত্তাব্যবস্থা, আইন প্রয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে। স্বজনহারা পরিবারগুলোর কাছে কোনো ক্ষতিপূরণই প্রিয়জনের শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না। তবু প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন, দায় নির্ধারণ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

এ জন্য তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ, আগের নোটিশ ও জরিমানার পর নেওয়া পদক্ষেপের তথ্য জানানো এবং অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি পর্যটন এলাকার হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর অগ্নিনিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং জরুরি বহির্গমনব্যবস্থা নিয়মিত যাচাই করতে হবে।

কোনো স্থাপনায় ঝুঁকি শনাক্ত হওয়ার পর সেই ঝুঁকি দূর হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত যেন শুধু আগুনের সূত্রপাত নির্ধারণে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং পূর্ববর্তী সতর্কবার্তা, অনুমোদনসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বও যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা হয়। দশটি প্রাণহানির ঘটনায় দায় প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন
© ২০২৬- প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন: ইয়োলো হোস্ট

You cannot copy content of this page