
অধিকৃত পশ্চিম তীরের কুসরা গ্রামে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযানের মধ্যে প্রায় এক ডজন ফিলিস্তিনি পরিবারকে নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।
স্থানীয়দের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, রোববার থেকে বসতি স্থাপনকারীরা কুসরার তিনটি ফিলিস্তিনি বাড়ির বাসিন্দাদের অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। এ সময় বাড়িগুলোর পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
পরে ইসরায়েলি বাহিনী বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। তবে অভিযানের সময় কয়েকটি ফিলিস্তিনি পরিবারকেও বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
কুসরার মেয়র আবদেল আজিম ওয়াদি বলেন, গ্রামটিকে ‘বন্ধ সামরিক এলাকা’ ঘোষণা করা হয়েছে। খালি করে দেওয়া কয়েকটি ফিলিস্তিনি বাড়ি ইসরায়েলি বাহিনী সামরিক ব্যারাক হিসেবে ব্যবহার করছে।
ঘেরাও করে রাখা আবু রিদি ও হাসান পরিবারের তিনটি বাড়ির মধ্যে দুটির বাসিন্দাদের বৃহস্পতিবার বাড়ি ছাড়তে বলা হয়। পরে তারা তৃতীয় বাড়িটিতে আশ্রয় নেন। গ্রামের আরও ১১টি বাড়ির বাসিন্দাকেও সেনাবাহিনী বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
কাহের ওদেহ নামে এক বাসিন্দা বলেন, সকালে ২০ জনের বেশি সেনা তার বাড়িতে প্রবেশ করে। পরে সেনারা চলে গেলেও আবার ফিরে এসে বাড়িটিকে সামরিক অবস্থান হিসেবে উল্লেখ করে তাকে ও তার ভাইকে সরে যেতে বলে।
ওদেহ জানান, তারা বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর পুরো এলাকা ইসরায়েলি বাহিনী ঘিরে ফেলে। এ সময় অনেক বাসিন্দাকে নিজেদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।
প্রায় ১০ ঘণ্টা পর কয়েকটি পরিবারকে বাড়িতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে ফিরে গিয়ে তারা ঘরের জিনিসপত্র তছনছ অবস্থায় দেখতে পান। এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, সেনারা ফ্রিজের খাবার বাইরে ফেলে দেয় এবং ১ হাজার ৫০০ ডলার নগদ অর্থ নিয়ে যায়। এসব অভিযোগের বিষয়ে বিবিসির প্রশ্নের জবাব দেয়নি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)।
আইডিএফ জানিয়েছে, কুসরা ও জালুদ এলাকার কাছে তারা দুটি ‘অবৈধ ফাঁড়ি’ সরিয়ে দিয়েছে। অভিযানে একজন ইসরায়েলিকে আটক এবং কিছু সরঞ্জাম জব্দ করার কথাও জানিয়েছে তারা।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, বাসিন্দাদের সুরক্ষার লক্ষ্যেই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ইসরায়েলি সরকারের মুখপাত্র ডেভিড মেনসার বসতি স্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ডকে ‘দুঃখজনক’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেছেন। দায়ীদের তদন্ত করে গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
তবে আবু রিদি বিবিসিকে জানান, বুধবার রাতেও তাদের বাড়িতে হামলা হয়েছে। কয়েকজন বসতি স্থাপনকারী সেনাবাহিনীর কাছ থেকে লুকিয়ে এখনও এলাকায় অবস্থান করছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
আবু রিদির ভাই বাড়িটির মালিক। তিনি একজন ফিলিস্তিনি-আমেরিকান ব্যবসায়ী এবং এ ঘটনায় মার্কিন দূতাবাসে অভিযোগ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি কুসরার পরিবারগুলোকে বসতি স্থাপনকারীদের ভয় দেখানোর ঘটনাকে ‘ভয়াবহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেছেন।
রোববার ঘটনাটি শুরু হওয়ার পর বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর বাড়ির প্রবেশপথ আটকে পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ঘটনাস্থলে যাওয়া প্রথম দিকের কয়েকজন ইসরায়েলি সেনাকে বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে প্রার্থনা করতেও দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, সংশ্লিষ্ট সেনাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বুধবার বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালায় ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী। এ সময় বড় একটি দলের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ও শব্দবোমা ব্যবহার করা হয়।
ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, কুসরার বাসিন্দাদের নিজেদের বাড়িতে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি বসতি স্থাপনকারীদের অবরোধের শিকার ফিলিস্তিনি বাড়িগুলোর ভেতরে সেনারা অভিযান চালাবে না বলেও জানিয়েছে তারা।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ বলে বিবেচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব বসতির সম্প্রসারণ এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগও বেড়েছে।