1. info@www.media71bd.com : NEWS TV : NEWS TV
  2. info@www.media71bd.com : TV :
বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৩:২১ অপরাহ্ন

ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বন্দী এক রাজনীতি: বেগম খালেদা জিয়ার উত্থান–পতনের কঠোর পাঠ

সম্পাদকীয়
  • Update Time : মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫

সংবাদে জানা গেছে, আজ ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ভোর ৬টার দিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেছেন। এই মৃত্যু কেবল একজন রাজনীতিকের জীবনাবসান নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ, সংঘাতময় ও অমীমাংসিত অধ্যায়ের সমাপ্তি।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান ছিল ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। কোনো দীর্ঘ ছাত্ররাজনীতি বা গণআন্দোলনের ভিতর দিয়ে নয়, বরং সামরিক শাসন-পরবর্তী এক রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন। কিন্তু সেই সুযোগকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার পরিবর্তে তিনি বেছে নেন ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতির পথ—যা পরবর্তী তিন দশক ধরে দেশের রাজনীতিকে দ্বন্দ্ব, প্রতিশোধ ও অবিশ্বাসের চক্রে আবদ্ধ করে রাখে।

১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে তাঁর বড় অবদান। কিন্তু সেই অর্জনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা, রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয়করণ এবং বিরোধী কণ্ঠকে দমন করার প্রবণতা দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তা পরবর্তী সময়ে তাঁর নিজের জন্যই হয়ে দাঁড়ায় আত্মঘাতী।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব ছিল আদর্শের নয়, ছিল ক্ষমতার। এই দ্বন্দ্ব রাজনীতিকে বিভক্ত করেছে ‘আমরা বনাম তারা’—এই সরল কিন্তু বিপজ্জনক সমীকরণে। ফলাফল হিসেবে সংসদ অকার্যকর হয়েছে, নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, রাজপথে সহিংসতা হয়েছে নিত্যদিনের ঘটনা। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়েছে—এ দায় থেকে বেগম খালেদা জিয়া যেমন মুক্ত নন, তেমনি তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও নয়।

২০০১–২০০৬ মেয়াদে তাঁর সরকারের সময় জঙ্গিবাদের উত্থান, প্রশাসনিক অকার্যকারিতা ও দুর্নীতির অভিযোগ ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। সে সময় এসব সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ছিল বলেই আজও অনেক প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত। এই ব্যর্থতাই পরবর্তীতে ওয়ান-ইলেভেনের মতো অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পথ প্রশস্ত করে—যার শিকার শেষ পর্যন্ত তিনিও নিজেই হন।

কারাবাস, বিচার ও দীর্ঘ অসুস্থতা তাঁর রাজনৈতিক পতনকে আরও নির্মমভাবে দৃশ্যমান করে তোলে। কিন্তু সবচেয়ে বড় পতন ছিল রাজনৈতিকভাবে উত্তরাধিকার গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়া। দলকে গণতান্ত্রিক কাঠামোয় রূপান্তর না করে পরিবারনির্ভর নেতৃত্ব বজায় রাখার সিদ্ধান্ত বিএনপিকে আজ গভীর সংকটে ফেলেছে—যার দায় ইতিহাস তাঁকেও দেবে।

রাজনীতির শেষ পর্যায়ে এসে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন কার্যত নীরব এক প্রতীক। রাজপথে তাঁর অনুপস্থিতি প্রমাণ করেছে—ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি টেকসই নয়। ক্ষমতা হারালে সেই রাজনীতি দ্রুতই প্রাসঙ্গিকতা হারায়।

তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়: আমরা কি এখনও ব্যক্তি ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি? গণতন্ত্র কি এখনও ক্ষমতার লড়াইয়ের হাতিয়ার হয়েই থাকবে?

ইতিহাস বেগম খালেদা জিয়াকে মনে রাখবে একজন শক্তিশালী, কিন্তু বিতর্কিত নেত্রী হিসেবে—যাঁর উত্থান যেমন ছিল সাহসী, পতন তেমনি অনিবার্য। তাঁর জীবন রাজনীতিবিদদের জন্য একটি নির্মম শিক্ষা: প্রতিষ্ঠান ছাড়া ক্ষমতা টেকে না, আর প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত রাজনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই মৃত্যু যদি রাজনীতিকে আত্মসমালোচনার পথে না নেয়, তবে তা হবে আরেকটি হারিয়ে যাওয়া সুযোগ—যার দায় বহন করবে পুরো জাতি।

More News Of This Category

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয়

ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট
error: Content is protected !!