আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে রাজধানীসহ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে নানামুখী গুজব। সর্বত্রই এখন একটাই প্রশ্ন—নির্বাচন আদৌ হবে তো? নির্বাচন হলে সেদিন সহিংসতা, মারামারি বা অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হবে কিনা, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী না হলে কী ঘটবে—এমন নানা আশঙ্কা ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।
নির্বাচনের দিন কিছু দল পরাজয় আঁচ করতে পেরে হঠাৎ বয়কট করে মাঠে নেমে অরাজকতা সৃষ্টি করতে পারে—এমন গুজবও ছড়িয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, পরাজয় নিশ্চিত জেনে অনেক রাজনীতিক দেশ ছাড়তে পারেন। আবার সরকারি চাকরিজীবীদের অবস্থান পরিবর্তন, ভোটের পর ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব, নতুন সরকার গঠন ও শপথ অনুষ্ঠান নিয়েও চলছে নানা আলোচনা ও প্রশ্ন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস আরও ছয় মাস ক্ষমতায় থাকবেন কিনা, তিনি ক্ষমতা ছাড়তে না চাইলে কী হবে, বর্তমান উপদেষ্টাদের শেষ কর্মদিবস কবে—এমন প্রশ্নও আলোচনায় রয়েছে। পাড়ামহল্লা থেকে অফিস-আদালত, চায়ের দোকান থেকে হোটেল-রেস্তোরাঁ—সবখানেই এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন কবে হবে—এ প্রশ্ন ঘুরছিল জনমনে। গত বছরের ৫ জানুয়ারি ব্রিটিশ এমপি রূপা হকের সঙ্গে সাক্ষাতে তিনি জানিয়েছিলেন, নির্বাচন হতে পারে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর বা ২০২৬ সালের মাঝামাঝি।
পরে ১২ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তফশীল ঘোষণা করেন। এরপরও নির্বাচন হবে কিনা—এ নিয়ে গুজব থামেনি। বরং ভোটের দিন যত ঘনিয়ে এসেছে, ততই গুজবের মাত্রা বেড়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, কেউ নির্বাচন ঠেকাতে পারবে না। একটি মহল নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে—তাদের যে কোনো মূল্যে প্রতিহত করা হবে। মাঠপর্যায়ে জেলা প্রশাসকরা জানিয়েছেন, নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন এবং কোনো ধরনের হুমকি নেই। দেশজুড়ে নির্বাচনি আমেজ বিরাজ করছে, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরাও সহযোগিতা করছে বলে দাবি তাদের।
রাজধানীর পুরানাপল্টনের অটোরিকশাচালক মো. ইব্রাহিম বলেন, সহিংসতার আশঙ্কায় তিনি ভোটের দিন কাজে নামবেন না। তার মতে, নির্বাচন হবে ঠিকই, কিন্তু ফলাফল কবে পাওয়া যাবে—তা অনিশ্চিত।
বাংলাদেশ সচিবালয়ের এক কর্মচারী হেলাল উদ্দিন বলেন, উপদেষ্টাদের শেষ কর্মদিবস, ফলাফল প্রকাশ এবং পরবর্তী ধাপগুলো নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী হেমায়েত আলী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বড় দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের ঝুঁকি রয়েছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যে দল হারতে পারে, তারা নির্বাচন বয়কট করলে বড় ধরনের সহিংসতা ছড়াতে পারে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা বশির উদ্দিন বলেন, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার না থাকায় বিজয়ী এমপিদের শপথ এবং নতুন সরকার গঠন প্রক্রিয়া নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে।
আইডিয়াল কলেজের শিক্ষক মো. কামাল হোসেন বলেন, ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। গুজব দূর করাও জরুরি।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী পরিচালক ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, নির্বাচন কমিশন ও সরকার যৌথভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করবে। তিনি নাগরিকদের গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানান।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন বলেন, সরকার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব নির্বাচিত সরকারের কাছে হস্তান্তর করে বিদায় নেবে। উপদেষ্টারা ইতোমধ্যে তাদের কাজ গুছিয়ে নিয়েছেন এবং সরকারি বাসা ছেড়েছেন বলেও জানান তিনি।
গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে ভোটের দিন দলবদ্ধভাবে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয়