ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে ২০ বছর পর আবারও সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আগামী মঙ্গলবার শপথ নেবেন নতুন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা। নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে আলোচনা যখন তুঙ্গে, তখন ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠনের ঘোষণা দিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন জামায়াত নেতা ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।
সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি-এর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন শিশির মনির। এরপর শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তিনি লেখেন, “আমরা ছায়া মন্ত্রিপরিষদ গঠন করব ইনশাআল্লাহ।” তাঁর এই স্ট্যাটাস রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে।
এই আলোচনা আরও গতি পায় যখন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া একই ধরনের ঘোষণা দেন। রোববার সকালে ফেসবুকে তিনি লেখেন, “আমরা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং সার্বিক কার্যক্রমে ওয়াচডগ হিসেবে কাজ করবে ছায়া মন্ত্রিসভা।”
বিশ্ব রাজনীতিতে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ মূলত ওয়েস্টমিনস্টার ধারার সংসদীয় ব্যবস্থার একটি পরিচিত ধারণা। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী বিরোধী দলগুলো নিজেদের ছায়া মন্ত্রিসভা ঘোষণা করে থাকে। এটি সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, সমালোচনা এবং বিকল্প নীতি প্রস্তাব দেওয়ার জন্য গঠিত একটি কাঠামো।
ছায়া মন্ত্রিসভায় সাধারণত সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে বিরোধী দল একজন করে ‘ছায়া মন্ত্রী’ মনোনয়ন দেয়। তাঁদের কাজ হলো সরকারের নীতি, বাজেট ও কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করা, প্রয়োজনীয় সমালোচনা তুলে ধরা এবং বিকল্প পরিকল্পনা উপস্থাপন করা।
যেমন, যুক্তরাজ্য-এ বিরোধী দলের ছায়া মন্ত্রিসভা নিয়মিতভাবে সরকারের নীতি পর্যবেক্ষণ করে এবং সংসদে প্রশ্ন তোলার মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করে। একইভাবে অস্ট্রেলিয়াতেও বিরোধী দলের ছায়া মন্ত্রিসভা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছায়া মন্ত্রিসভা শুধু সরকারের সমালোচনার জন্য নয়; এটি বিরোধী দলের জন্য রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ ও নির্বাচনী প্রস্তুতিরও কার্যকর হাতিয়ার। এর মাধ্যমে নেতা–কর্মীরা প্রশাসনিক কাঠামো, বাজেট ও নীতি প্রণয়নের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পাশাপাশি জনগণের কাছে নিজেদের প্রস্তুত ও দায়িত্বশীল দল হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের নজির নেই। সংবিধান বা প্রচলিত কাঠামোতে এর কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই। তবে সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সময় ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। ক্ষমতাসীন দলের নীতি ও কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে উঠলে রাজনৈতিক ভারসাম্য আরও সুসংহত হতে পারে।
জামায়াত নেতা শিশির মনির ও এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদের ঘোষণার পর দেশে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিএনপির নতুন সরকার গঠনের প্রাক্কালে এই উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়িত হয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয়