
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন বারুদের গন্ধ। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধ আর পর্দার আড়ালে সীমাবদ্ধ নেই, তা এখন সরাসরি এক প্রলয়ংকরী সামরিক সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে এসে একে অপরের উপর সংঘাত ও সংঘর্ষের মধ্যে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। গোয়েন্দা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ইরানি ভূখণ্ডে আনুষ্ঠানিক ভাবে মার্কিন হামলা শুরু হতে পারে। এই চরম উত্তেজনার মুখে ইরান তার আকাশপথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিল এবং সাময়িক ভাবে অবমুক্ত করেছে কিন্তু আবার যে কোন সময় পূর্বের ন্যায় বন্ধ ঘোষণা করেতে পারে। এমতাবস্থায় ইরান ইতোমধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
থমথমে পরিস্থিতির মাঝে বিশ্ববাসী এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে আছে।
মার্কিন রণতরীর মহড়া ও হামলার প্রস্তুতি:- যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির অন্যতম স্তম্ভ USS Abraham Lincoln তার শক্তিশালী ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ নিয়ে বর্তমানে ইরান উপকূলের দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। এই বহরে রয়েছে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ডেস্ট্রয়ার, ক্রুজার এবং পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন। এছাড়া লোহিত সাগরে আগে থেকেই অবস্থান করছে USS Roosevelt।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) তথ্যমতে, ৭৫টিরও বেশি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হানার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতেও বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত সেনা ও রসদ মোতায়েন করা হয়েছে, যা একটি বড় মাপের যুদ্ধের আগাম সঙ্কেত দিচ্ছে।
ইরানের কঠোর পাল্টাহুঁশিয়ারি ও প্রতিরক্ষা প্রাচীর:- মার্কিন হুমকির মুখে তেহরানও হাত গুটিয়ে বসে নেই। ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) তাদের সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে।
ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া পাল্টা পদক্ষেপগুলো হলো:
* প্রণালী ও আকাশপথ অবরোধ:- ইরান তাদের আকাশপথ পুরোপুরি বন্ধ করার পাশাপাশি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছে।
* প্রতিবেশী দেশগুলোকে ইরানের সতর্কবার্তা:- তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনো প্রতিবেশী দেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের মাটি বা আকাশপথ ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অনুমতি দেয়, তবে সেই দেশকেও সরাসরি শত্রু হিসেবে গণ্য করে হামলা চালানো হবে।
* রুশ S-400 প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা:- মার্কিন বিমান হামলা রুখতে ইরান রাশিয়ার কাছ থেকে পাওয়া বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী S-400 আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করেছে। এটি পেন্টাগনের পরিকল্পনাবিদদের জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাশিয়ার ‘রেড লাইন’ ও চীনের অর্থনৈতিক কূটনীতি:- এই সংকটে ইরানের পাশে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়েছে বিশ্বের অপর দুই পরাশক্তি রাশিয়া ও চীন। তাদের অবস্থান এই সংঘাতকে দ্বিপাক্ষিক গণ্ডি ছাড়িয়ে বৈশ্বিক রূপ দিয়েছে।
রাশিয়ার সামরিক ঢাল:- ক্রেমলিন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ইরানে হামলা হবে ওয়াশিংটনের জন্য ইতিহাসের “সবচেয়ে বড় ভুল”। ভ্লাদিমির পুতিন বিষয়টিকে রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য ‘রেড লাইন’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
গোয়েন্দা তথ্য মতে, রাশিয়া তাদের স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে মার্কিন রণতরীর রিয়েল-টাইম গতিবিধি তেহরানকে সরবরাহ করছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানের ড্রোন সহযোগিতার প্রতিদান হিসেবে মস্কো এবার সরাসরি ইরানের আকাশ সুরক্ষায় প্রযুক্তিগত ও সামরিক সহায়তা দিচ্ছে।
চীনের কৌশলগত চাপ:- বেইজিং সাধারণত সংযমের কথা বললেও পর্দার আড়ালে তারা বেশ আক্রমণাত্মক। ইরানের তেলের বৃহত্তম ক্রেতা হিসেবে চীন পরিষ্কার করেছে যে, তাদের জ্বালানি নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটলে তারা বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানবে। এছাড়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যেকোনো মার্কিন প্রস্তাব রুখতে চীন ও রাশিয়া তাদের যৌথ ‘ভেটো’ ক্ষমতা ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
একটি নতুন ‘ত্রিপক্ষীয় অক্ষ’ (Triple Axis)
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য খর্ব করতে রাশিয়া, চীন এবং ইরান মিলে একটি অলিখিত ‘ত্রিপক্ষীয় অক্ষ’ গড়ে তুলেছে। তাদের এই জোটের লক্ষ্য তিনটি:-
১. মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটানো।
২. ডলারের আধিপত্য ভেঙে নিজস্ব মুদ্রায় তেল বাণিজ্য নিশ্চিত করা।
৩. এই অঞ্চলে ইসরায়েলের একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ করা।
সমাপনী পরিস্থিতি:- খাদের কিনারায় বিশ্ব শান্তি
১৯৭০-এর দশকের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান বর্তমানে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, অন্যদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী চাপ। তবে ইরানের দাবি, তারা এমন এক “ঐতিহাসিক জবাব” দিতে প্রস্তুত যা বিশ্ব আগে কখনো দেখেনি। পারস্য উপসাগরে ইরানের নৌবাহিনী ইতিমধ্যে মার্কিন জাহাজগুলোকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মুহূর্তে যেকোনো একটি ভুল পদক্ষেপ বা সামান্য ভুল বোঝাবুঝি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের এই আগ্নেয়গিরি যদি একবার বিস্ফোরিত হয়, তবে তার প্রভাব কেবল এই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে ওলটপালট করে দেবে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৫
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি
Leave a Reply