ইসলামে নাম রাখার গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষের পরিচয়ের সবচেয়ে মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো তার নাম। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতকে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি ভালো ও অর্থবোধক নাম রাখতে উৎসাহিত করেছেন এবং মন্দ ও অসুন্দর নাম রাখা থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। এমনকি মন্দ নাম থাকলে তা পরিবর্তনের নির্দেশও দিয়েছেন। কারণ সুন্দর নাম মানুষের মনে ভালো অনুভূতি সৃষ্টি করে, ব্যক্তিত্বের একটি সুন্দর প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলে এবং জীবনে ইতিবাচক অভিজ্ঞতার পথ খুলে দেয়।
নবজাতক শিশুর সুন্দর নাম রাখা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সুন্দর নাম হলো আবদুল্লাহ এবং আবদুর রহমান।’ (মুসলিম : ২১৩২)। এ হাদিস থেকেই বোঝা যায়, নামের অর্থ ও তাৎপর্য ইসলামে কতটা গুরুত্ব বহন করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মন্দ নাম পরিবর্তন করতে কখনোই কুণ্ঠাবোধ করতেন না। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) মন্দ নাম বদলে দিতেন।’ (তিরমিজি : ২৮৯)। অর্থাৎ নামের মাধ্যমে যেন নেতিবাচক অর্থ বা ধারণা প্রকাশ না পায়—এ বিষয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন।
হজরত আলি (রা.) থেকে বর্ণিত এক ঘটনায় দেখা যায়, হাসান (রা.) জন্মগ্রহণের পর তিনি তার নাম রেখেছিলেন ‘হারব’ (যুদ্ধ)। রাসুল (সা.) এসে নাম জানতে চাইলে বলেন, ‘বরং তার নাম হাসান।’ একইভাবে হুসাইন (রা.) ও তৃতীয় সন্তানের ক্ষেত্রেও তিনি ‘হারব’ নাম পরিবর্তন করে ‘হুসাইন’ ও ‘মুহাসসিন’ রাখেন। এরপর তিনি বলেন, হারুন (আ.)-এর সন্তান শাবার, শুবাইর ও মুশাব্বিরের নামানুসারেই তিনি তাদের নাম রেখেছেন। (মুসনাদে আহমাদ : ৭৬৯)। এ ঘটনা প্রমাণ করে, এমনকি পরিবারের নিকটাত্মীয়দের ক্ষেত্রেও তিনি অর্থবোধক ও সুন্দর নাম নিশ্চিত করেছেন।
শুধু শিশু নয়, বড়দের ক্ষেত্রেও নাম অপছন্দ হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তা পরিবর্তন করতেন। ইবনে মুসাইয়িব (রহ.) থেকে বর্ণিত, তার পিতা একবার রাসুল (সা.)-এর কাছে গেলে তিনি নাম জিজ্ঞেস করেন। উত্তরে বলা হয়, নাম ‘হাজন’ (কঠিন বা প্রতিকূল)। রাসুল (সা.) বলেন, ‘বরং তোমার নাম সাহল।’ কিন্তু তিনি তা পরিবর্তন করতে অস্বীকৃতি জানান। পরে ইবনে মুসাইয়িব (রহ.) বলেন, ‘এরপর থেকেই আমাদের জীবনে প্রতিকূলতা লেগেই থাকে।’ (বোখারি : ৫৮৩৬)।
রাসুল (সা.)-এর সাহাবি বশির (রা.)-এর নাম জাহেলি যুগে ছিল ‘জাহম’। হিজরতের পর রাসুল (সা.) তার নাম জিজ্ঞেস করে তা পরিবর্তন করে ‘বশির’ রাখেন। (আবু দাউদ : ৩২৩০)। একইভাবে এক প্রতিনিধি দলের সদস্য ‘আসরাম’ নাম শুনে রাসুল (সা.) তা পরিবর্তন করে ‘জুরআ’ রাখেন। (আবু দাউদ : ৪৯৫৪)।
এসব হাদিস ও ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, ইসলামে নাম কেবল পরিচয়ের মাধ্যম নয়; বরং তা মানুষের চিন্তা, মনন ও জীবনের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত সন্তানের জন্য অর্থবোধক, সুন্দর ও উত্তম নাম নির্বাচন করা, যা তার ব্যক্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।