ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কার্যক্রম-নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করতে না পারলেও দলটির শরিক দলগুলো এবং জাতীয় পার্টি (জাপা) নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। তবে জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের মালিকানা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বিপাকে পড়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৫৬টি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় দলটি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। তবে বাকি ৫৫টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে। সে হিসেবে আওয়ামী লীগের সময়কার মহাজোটভুক্ত জাপা, জাসদসহ অন্যান্য শরিক দলের নির্বাচনে অংশ নিতে আইনগত কোনো বাধা নেই।
এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, আওয়ামী লীগ অংশ নিতে না পারলেও জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে সরকার কোনো বাধা দেবে না। আইনিভাবে নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। তবে আওয়ামী লীগের বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট—রিফাইন্ড বা অন্য কোনো নামেও দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না, কারণ তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ।
এদিকে জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি জানিয়েছে, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হলেই তারা নির্বাচনে অংশ নেবে। দলটি ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে অংশ নিয়ে সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করলেও পরে আওয়ামী লীগ সরকারের নানা সিদ্ধান্তে সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
হাসিনা সরকারের পতনের পর ঐকমত্য কমিশন, সরকার কিংবা নির্বাচন কমিশনের কোনো আলোচনায় আওয়ামী লীগের শরিক দলগুলোকে ডাকা হয়নি। এমনকি জাতীয় পার্টিসহ এসব দল নিষিদ্ধ করার দাবিও উঠেছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণে তাদের বাধা দিচ্ছে না।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, মাঠের পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা, ভোটের নিরাপত্তা এবং প্রার্থী ও পোলিং এজেন্টদের নিরাপত্তা বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সূত্র জানায়, জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরই মধ্যে রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন প্রার্থী ও কিছু ‘চমক’ রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।
জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এস এম ইয়াসির বলেন, দলটি এককভাবে নির্বাচন করবে এবং রংপুর বিভাগসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শক্ত ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী দেবে। তবে নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে লাঙ্গল প্রতীকের মালিকানা নিয়ে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের দাবিদার একাধিক, ফলে প্রকৃত মালিক নির্ধারণে সমস্যা হচ্ছে।
এরপর ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারের নেতৃত্বাধীন অংশ দাবি করে, তারাই জাতীয় পার্টির বৈধ নেতৃত্ব এবং লাঙ্গল প্রতীকের একমাত্র দাবিদার। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, গত ৯ আগস্ট অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সম্মেলনে তিনি চেয়ারম্যান ও রুহুল আমিন হাওলাদার মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের মতে, জিএম কাদের বর্তমানে দলের সাধারণ সদস্য মাত্র।
অন্যদিকে জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন অংশ দাবি করছে, লাঙ্গল প্রতীকের বৈধ মালিক জিএম কাদের এবং এ নিয়ে কোনো বিতর্কের সুযোগ নেই।
জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এদিকে আরেকটি নতুন জোট আত্মপ্রকাশ করেছে। জাতীয় পার্টির একাংশ ও জাতীয় পার্টি (জেপি)-এর নেতৃত্বে গঠিত এই জোটের নাম ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’ (এনডিএফ)। এতে মোট ১৮টি দল রয়েছে, যার মধ্যে ৬টি নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত।
এনডিএফের প্রধান উপদেষ্টা করা হয়েছে জাতীয় পার্টি (জেপি)-এর চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে। সভাপতি হয়েছেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং প্রধান মুখপাত্র হয়েছেন এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার। জোটের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ব্রুনেই দূতাবাসের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের বাইরে থাকা, জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণের প্রস্তুতি এবং লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে দ্বন্দ্ব—ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে।