
ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তিচুক্তির জন্য মস্কোর ওপর চাপ বাড়াতে রাশিয়ার দুটি বৃহত্তম তেল কোম্পানি— রসনেফট ও লুকোয়েলের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার (২২ অক্টোবর) এই পদক্ষেপের ঘোষণা দেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। তিনি বলেন, “পুতিনের অযৌক্তিক যুদ্ধ বন্ধে অস্বীকৃতির কারণেই এই নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। এসব তেল কোম্পানি ক্রেমলিনের যুদ্ধযন্ত্রকে অর্থায়ন করে।”
বেসেন্ট আরও বলেন, “হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির এখনই সময়।” বুধবার হোয়াইট হাউসে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “যতবার আমি ভ্লাদিমিরের সঙ্গে কথা বলি, ভালো আলোচনা হয়, কিন্তু তা কোথাও পৌঁছায় না।”
ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞার প্যাকেজটিকে “অসাধারণ” উল্লেখ করে বলেন, “রাশিয়া যদি যুদ্ধ বন্ধে রাজি হয়, তবে এই নিষেধাজ্ঞাগুলো দ্রুত প্রত্যাহার করা যেতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “আমার মনে হয়েছে, সময় এসেছে। আমরা অনেকদিন অপেক্ষা করেছি।”
নিষেধাজ্ঞার পদক্ষেপটির প্রশংসা করে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে বলেন, “এটি পুতিনের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করছে। চাপ দেওয়া প্রয়োজন, আর সেটিই আজ তিনি করেছেন।” ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে জানান, ইইউ-র নতুন নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজে রাশিয়ান তরল প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “ইইউ’র ১৯তম নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজের অনুমোদনের মাধ্যমে ইউরোপ ও আমেরিকা উভয় দিক থেকেই স্পষ্ট বার্তা যাচ্ছে— আমরা আগ্রাসীর ওপর যৌথ চাপ বজায় রাখব।”
এর আগে, গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্যও রসনেফট ও লুকোয়েলের ওপর একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেয়। যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস বলেন, “বিশ্ববাজারে রাশিয়ান তেলের কোনো স্থান নেই।” লন্ডনে রাশিয়ার দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানায়, প্রধান জ্বালানি কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটাবে এবং জ্বালানির দাম বাড়াবে। দূতাবাসের মতে, “এই ধরনের চাপ শান্তিপূর্ণ আলোচনাকে আরও জটিল করে তোলে এবং বৈশ্বিক উত্তেজনা বৃদ্ধি করে।”
রসনেফট ও লুকোয়েল প্রতিদিন প্রায় ৩.১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করে। রসনেফট একাই রাশিয়ার মোট উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করে, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ৬ শতাংশ। তেল ও গ্যাস রাশিয়ার প্রধান রপ্তানি পণ্য। মস্কোর সবচেয়ে বড় ক্রেতা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, ভারত ও তুরস্ক। ট্রাম্প এই দেশগুলোকেও রাশিয়ান তেল কেনা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপার যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে “অত্যন্ত স্বাগত” জানিয়ে বলেন, “এটি রাশিয়ার ওপর আর্থিক চাপ বাড়াবে।”
নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার একদিন আগে ট্রাম্প রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বুদাপেস্টে নির্ধারিত বৈঠকটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেন। হোয়াইট হাউস জানায়, আলোচনায় প্রধান অচলাবস্থা হচ্ছে মস্কোর বর্তমান যুদ্ধরেখায় লড়াই বন্ধে অস্বীকৃতি। ট্রাম্প বলেন, “আমি বলেছি, যুদ্ধরেখায় থেমে যাও। বাড়ি ফিরে যাও। লড়াই বন্ধ করো, মানুষ হত্যা বন্ধ করো।” রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ পাল্টা বলেন, “রাশিয়ার অবস্থানে কোনো পরিবর্তন নেই।”
রাশিয়ার সাম্প্রতিক বোমাবর্ষণে ইউক্রেনে শিশুসহ অন্তত সাতজন নিহত হওয়ার একদিন পরই যুক্তরাষ্ট্র এই নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য রাশিয়ার আরও দুটি বড় জ্বালানি কোম্পানি— গ্যাজপ্রম নেফট ও সুরগুতনেফতেগ্যাস—এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ন্যাটো মহাসচিব রুটে ও ট্রাম্প ইউরোপীয় ন্যাটো মিত্র ও কিয়েভের প্রণীত ১২ দফা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন, যেখানে যুদ্ধবিরতি, শিশু প্রত্যাবর্তন, বন্দি বিনিময়, যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন তহবিল এবং ইউক্রেনের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ট্রাম্প সম্প্রতি আলাস্কায় পুতিনের সঙ্গে সর্বশেষ বৈঠক করেছিলেন, যার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর আশায় হোয়াইট হাউস উচ্চ প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু তাতেও লড়াই অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের মধ্যে নির্ধারিত প্রস্তুতিমূলক বৈঠকও বাতিল করা হয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, “যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকুক।” তিনি যোগ করেন, “আমি বলেছি, যুদ্ধরেখায় থেমে যাও। মানুষ হত্যা বন্ধ করো।” তবে রাশিয়া এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে, এবং ক্রেমলিন স্পষ্ট জানিয়েছে যে তারা দনবাস অঞ্চল থেকে ইউক্রেনীয় সেনাদের প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান পরিবর্তন করবে না।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৫
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি
Leave a Reply