২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের রাজনৈতিক প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ ২০২৬’ অনুমোদন দিয়েছে। এই অধ্যাদেশের আওতায় ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে সংগঠিত সব কর্মকাণ্ডের জন্য সংশ্লিষ্টরা ফৌজদারি দায় থেকে দায়মুক্তি পাবেন।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) সকালে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বিষয়টি জানান।
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন,
“অধ্যাদেশে রাজনৈতিক প্রতিরোধ বলতে আমরা বুঝিয়েছি ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সংগঠিত কার্যাবলি। জুলাই ও আগস্টে এ উদ্দেশ্যে সংঘটিত কর্মকাণ্ডের জন্য জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের ফৌজদারি দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।”
তিনি জানান, রাজনৈতিক প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে যেসব ফৌজদারি মামলা হয়েছে, সেগুলো সরকার প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা দায়ের করা যাবে না।
তবে দায়মুক্তির বিষয়টি স্পষ্ট করে সতর্কবার্তা দেন আইন উপদেষ্টা। তিনি বলেন,
“রাজনৈতিক প্রতিরোধের নামে যদি কেউ ব্যক্তিগত বা সংকীর্ণ স্বার্থে, কিংবা লোভের বশবর্তী হয়ে হত্যাকাণ্ড বা অন্য কোনো অপরাধ করে থাকে, তাহলে সে এই দায়মুক্তির আওতায় আসবে না। ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে ফৌজদারি দায় বহাল থাকবে। এই আইন শুধুমাত্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে সামষ্টিকভাবে জড়িতদের জন্য প্রযোজ্য।”
কোন ঘটনা রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ এবং কোনটি ব্যক্তিগত স্বার্থে সংঘটিত—তা নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে। আসিফ নজরুল বলেন,
“কোনো ভুক্তভোগীর পরিবার যদি মনে করে তাদের স্বজন ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে নিহত হয়েছেন, তারা মানবাধিকার কমিশনে আবেদন করতে পারবেন। কমিশন তদন্ত করে যদি দেখে এটি ব্যক্তিগত স্বার্থে সংঘটিত, তবে সেই প্রতিবেদন পুলিশের রিপোর্টের মতো গণ্য হবে এবং বিচার চলবে। আর যদি রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ হিসেবে প্রমাণিত হয়, তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি দায়মুক্তি পাবেন।”
এক প্রশ্নের জবাবে আইন উপদেষ্টা বলেন,
“দায়মুক্তি বিষয়ে এ ধরনের অধ্যাদেশের নজির রয়েছে এবং সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদে এর সাংবিধানিক ভিত্তিও নিশ্চিত করা হয়েছে। যদিও কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে বা আইনগতভাবে একে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন, আমাদের বিশ্বাস—এই চ্যালেঞ্জ শেষ পর্যন্ত টিকবে না।”
তিনি আরও বলেন,
“১৯৭২ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পরও মুক্তিযুদ্ধকালীন কর্মকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তি আইন করা হয়েছিল, যা ওই বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সংজ্ঞা ও জুলাই সনদ বিবেচনায় নিয়ে আমরা দায়মুক্তির সময়সীমা শুধু জুলাই-আগস্ট মাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছি।”