আমাদের দেশে বুকজ্বালা, বদহজম বা পেট ফাঁপার মতো সমস্যাকে অনেকেই সাধারণ ‘গ্যাস্ট্রিক’ ভেবে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু দীর্ঘদিন অবহেলা করলে এসব সমস্যা গ্যাস্ট্রিক আলসারের মতো জটিল রোগে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে রমজান মাসে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার কারণে অনেকের গ্যাস্ট্রাইটিস ও আলসারের উপসর্গ বেড়ে যায় বলে চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন।
গ্যাস্ট্রিক আলসার কী?
গ্যাস্ট্রিক আলসার হলো পাকস্থলীর ভেতরের মিউকোসাল স্তরে তৈরি হওয়া গভীর ক্ষত। যখন এই ক্ষত গভীর হয়ে মাসকুলারিস মিউকোসা স্তর পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তখন তাকে গ্যাস্ট্রিক আলসার বলা হয়। একই ধরনের ক্ষত ক্ষুদ্রান্ত্রেও হতে পারে, যাকে ডিউডেনাল আলসার বলা হয়। তবে বাংলাদেশে গ্যাস্ট্রিক আলসারের প্রবণতাই বেশি দেখা যায়।
আলসার হওয়ার কারণ
গ্যাস্ট্রিক আলসারের পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস—যেমন অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, ঝাল-মসলাযুক্ত খাবার, ফাস্টফুড ও কোমল পানীয় নিয়মিত খাওয়া। এছাড়া ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ব্যথানাশক বা স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ সেবনও পাকস্থলীতে ক্ষত তৈরি করতে পারে। ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান এবং এইচ পাইলোরি নামের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণও আলসারের বড় কারণ। অনেকেই দীর্ঘদিন নিজের মতো করে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেয়ে সাময়িক আরাম পান, কিন্তু এতে মূল রোগ ধরা পড়ে না এবং জটিলতা বাড়তে পারে।
কী লক্ষণ দেখা যায়
গ্যাস্ট্রিক আলসারের লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ গ্যাস্ট্রিক সমস্যার মতোই মনে হয়। বুকের মাঝখানে জ্বালাপোড়া, পেট ফেঁপে থাকা, বদহজম, বমিভাব এবং পেটের উপরিভাগে ব্যথা—এসবই সাধারণ উপসর্গ। কারও ক্ষেত্রে খালি পেটে ব্যথা বাড়ে, আবার কারও ক্ষেত্রে খাবারের পর ব্যথা বাড়তে পারে। অনেক সময় কয়েকদিন ভালো থাকার পর আবার একই সমস্যা ফিরে আসে। দীর্ঘদিন আলসার থাকলে রক্তশূন্যতাও দেখা দিতে পারে।
দেরিতে ধরা পড়ে কেন
অধিকাংশ মানুষ পেটের সমস্যাকে তুচ্ছ ভেবে চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে ফার্মেসি থেকে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ কিনে খান। এতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও ভেতরে ভেতরে ক্ষত বাড়তে থাকে। দীর্ঘদিন অবহেলা করলে এই আলসার জটিল হয়ে গ্যাস্ট্রিক ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
রমজানে বাড়তি সতর্কতা
রমজানে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া বা ঝাল খাবার খাওয়া এবং পর্যাপ্ত পানি না পান করার কারণে গ্যাস্ট্রাইটিস ও আলসারের উপসর্গ বেড়ে যেতে পারে। তাই রোজাদারদের সেহরি ও ইফতারে পরিমিত ও সহজপাচ্য খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। উপসর্গ বাড়লে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রতিরোধের উপায়
গ্যাস্ট্রিক আলসার প্রতিরোধে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা জরুরি। ফাস্টফুড, কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার কম খাওয়া, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক বা স্টেরয়েড সেবন না করা এবং দীর্ঘদিন নিজে নিজে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ না খাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
যদি ঘন ঘন বুকজ্বালা, পেটব্যথা বা বদহজমের সমস্যা দেখা দেয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজন হলে এন্ডোস্কোপি করা উচিত। এন্ডোস্কোপির মাধ্যমে সরাসরি পাকস্থলী দেখে আলসার নির্ণয় করা সম্ভব, যা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যত দ্রুত গ্যাস্ট্রিক আলসার শনাক্ত করা যাবে, তত সহজে এবং কম খরচে এর চিকিৎসা করা সম্ভব। তাই অবহেলা নয়, সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসাই পারে এই নীরব কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ রোগ থেকে সুরক্ষা দিতে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয়