চন্দ্রবর্ষের অষ্টম মাস শাবান। আরবিতে এ মাসের পূর্ণ নাম ‘আশ শাবানুল মুআজজম’, অর্থ—মহান শাবান মাস। শাবান শব্দের অর্থ দূরে ও কাছে, মিলন ও বিচ্ছেদ এবং মধ্যবর্তী সুস্পষ্ট। রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী হওয়ায় এ মাসের নামকরণ করা হয়েছে শাবান। (লিসানুল আরব, ইবনে মানজুর রহ.)
শাবান মাসের পরই আসে পবিত্র রমজান। তাই এ মাসকে রমজানের আগমনী বার্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ মাসে বেশি বেশি নফল ইবাদত, নফল নামাজ ও নফল রোজা পালন করতেন এবং সাহাবিদেরও এতে উৎসাহিত করতেন।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন,
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাঁর ফেরেশতারা নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন। হে মুমিনগণ, তোমরাও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করো এবং যথাযথ শ্রদ্ধাভরে সালাম জানাও।’
(সুরা আহজাব : ৫৬)
হাদিস ও তাফসিরকারদের মতে, নবীজি (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠের নির্দেশনা সম্পর্কিত এ আয়াতটি শাবান মাসেই অবতীর্ণ হয়। তাই এ মাস নবীজির প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসা প্রকাশের এক বিশেষ সময়।
মিরাজের রাতে মুসলমানদের ওপর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়। প্রথমদিকে মুসলমানরা বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করতেন। নবীজি (সা.) চাইতেন কাবাঘরই মুসলমানদের কিবলা হোক।
অবশেষে হিজরতের ১৬ মাস পর শাবান মাসেই কাবাঘরকে মুসলমানদের কিবলা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন,
‘নিশ্চয়ই আমি তোমার আকাশের দিকে মুখ ফিরিয়ে দেখা লক্ষ্য করেছি… তোমরা যেখানেই থাক, মসজিদুল হারামের দিকেই মুখ ফিরাও।’
(সুরা বাকারা : ১৪৪)
রমজান ছাড়া অন্য মাসে ফরজ রোজা নেই। তবে শাবান মাসে নফল রোজার বিশেষ ফজিলত রয়েছে।
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন,
‘নবী (সা.) শাবান মাসের চেয়ে বেশি নফল রোজা অন্য কোনো মাসে রাখতেন না।’
(বোখারি : ১৯৭০)
তিনি প্রায় পুরো শাবান মাসেই রোজা রাখতেন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী আমল করতে উৎসাহ দিতেন।
শাবান মাসে নবীজি (সা.) বেশি বেশি দোয়া করতেন। তাঁর বহুল পঠিত দোয়া ছিল—
আরবি উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজবা ওয়া শাবান, ওয়া বাল্লিগনা রমাদান।
অর্থ:
‘হে আল্লাহ, রজব ও শাবান মাস আমাদের জন্য বরকতময় করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।’
(মুসনাদে আহমাদ : ২৫৯)
শাবান মাসের মধ্য দিবসের রাতকে বলা হয় শবেবরাত—অর্থ মুক্তির রাত। এ রাতে আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,
‘মধ্য শাবানের রাতে আল্লাহ নিকটবর্তী আকাশে অবতরণ করে বলেন—কে আছে ক্ষমাপ্রার্থী? কে আছে রিজিকপ্রার্থী?’
(ইবনে মাজাহ : ১৩৮৮)
হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণিত হাদিসে এসেছে, আল্লাহ এ রাতে বনু কালব গোত্রের বকরির পশমের সংখ্যার চেয়েও বেশি মানুষকে ক্ষমা করেন।
(তিরমিজি : ৭৩৯)
শাবান মাসে রোজা রাখতে না পারলে রমজানের পর কাজা আদায় করা যাবে। তবে তা বাধ্যতামূলক নয়।
রাসুল (সা.) বলেন,
‘রমজানের এক বা দুই দিন আগে রোজা রেখো না—তবে যার নিয়মিত অভ্যাস আছে, সে রাখতে পারবে।’
(আবু দাউদ : ১৩৩৫)
রমজানের প্রস্তুতি হিসেবে শাবান মাসের চাঁদের হিসাব রাখা সুন্নত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘রমজানের জন্য শাবানের চাঁদের হিসাব রাখো।’
(সিলসিলাতুস সহিহাহ)
শাবান মাস মুসলমানদের জন্য আত্মশুদ্ধি, ইবাদতের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং রমজানের প্রস্তুতির এক সুবর্ণ সুযোগ। এ মাস যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে রমজান হবে আরও ফলপ্রসূ ও অর্থবহ।