রোববার সকালে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)–এর মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তাঁর ফেসবুক পোস্টে “ছায়া মন্ত্রিসভা” গঠনের প্রস্তুতির ঘোষণা দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক ও আলোচনা সৃষ্টি করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগের লক্ষ্য হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সরকারের কার্যক্রমের ওপর একটি কার্যকর নজরদারি কাঠামো তৈরি করা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই ধারণা নতুন না হলেও, বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে এটি এখনও পরীক্ষিত নয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে—ছায়া মন্ত্রিসভা কি সত্যিই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে, নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক প্রতীকী পদক্ষেপ হয়ে থাকবে?
ছায়া মন্ত্রিসভা মূলত সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি প্রতিষ্ঠিত প্রথা, যেখানে বিরোধী দল সরকারকে সমান্তরালভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য বিকল্প নীতি ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে। যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে চালু আছে এবং এটি সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণ প্রায়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, সেখানে এমন একটি কাঠামো গণতান্ত্রিক চর্চায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—যদি তা বাস্তবভিত্তিক ও নীতিনিষ্ঠ হয়।
তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর। প্রথমত, ছায়া মন্ত্রিসভা কেবল ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা জনমনে আস্থা তৈরি করতে পারবে না। প্রতিটি খাতভিত্তিক নীতি বিশ্লেষণ, তথ্যভিত্তিক সমালোচনা এবং বিকল্প প্রস্তাবনা নিয়মিতভাবে প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, এর সদস্যদের দক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, যদি এই কাঠামো দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে গঠিত হয় এবং যোগ্যতার মানদণ্ড উপেক্ষিত থাকে, তাহলে এটি জনগণের কাছে গুরুত্ব হারাবে।
তৃতীয়ত, ছায়া মন্ত্রিসভার কাজ হতে হবে গঠনমূলক সমালোচনা করা—অন্ধ বিরোধিতা নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রায়ই দেখা যায়, বিরোধিতা মানেই সবকিছুর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। কিন্তু একটি কার্যকর ছায়া মন্ত্রিসভা সরকারের ভালো উদ্যোগকে সমর্থন করবে এবং দুর্বলতা চিহ্নিত করে সংশোধনের প্রস্তাব দেবে। এই ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলেই এটি গণতন্ত্রের একটি শক্তিশালী উপাদানে পরিণত হতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জনসম্পৃক্ততা। ছায়া মন্ত্রিসভা যদি জনগণের মতামত, বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ ও নাগরিক সমাজের সুপারিশকে অন্তর্ভুক্ত করে কাজ করে, তাহলে এটি কেবল রাজনৈতিক কাঠামো নয়—বরং একটি বিকল্প নীতিনির্ধারণী প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে। এতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নীতিগত প্রতিযোগিতা বাড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের শাসনব্যবস্থার মান উন্নত করবে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, দেশে কার্যকর সংসদীয় পরিবেশ ছাড়া ছায়া মন্ত্রিসভা বাস্তব প্রভাব ফেলতে পারবে না। কারণ, সংসদে শক্তিশালী বিরোধী উপস্থিতি ও বিতর্কের সংস্কৃতি না থাকলে এই কাঠামোর সুপারিশ বাস্তবে গুরুত্ব পাবে না। তাই এই উদ্যোগ সফল করতে হলে কেবল দলীয় উদ্যোগ নয়, সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশও সহায়ক হতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, ছায়া মন্ত্রিসভা ধারণাটি সম্ভাবনাময় হলেও এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগ, স্বচ্ছতা, দক্ষ নেতৃত্ব এবং ধারাবাহিক নীতিগত কর্মকাণ্ডের ওপর। এটি যদি কৌশলগত রাজনৈতিক প্রচারণা না হয়ে সত্যিকার অর্থে জনস্বার্থে পরিচালিত হয়, তবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চর্চায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। অন্যথায়, এটি ইতিহাসে আরেকটি ঘোষণামাত্র হিসেবেই থেকে যাবে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয়