৩০ ডিসেম্বর ২০২৫,
“জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে?”- প্রকৃতির এই অমোঘ নিয়মকে সত্য মেনে নিয়ে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। আজ মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
শোকাতুর শেষ মুহূর্ত:- হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ দিন ধরে বার্ধক্যজনিত জটিলতা ও নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি সিসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সময় শয্যাপাশে উপস্থিত ছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, যিনি দীর্ঘ ১৭ বছর পর সম্প্রতি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান, নাতনি জাইমা রহমান, ছোট পুত্রবধূ শারমিলা রহমান সিঁথি এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা। প্রিয় নেত্রীর প্রয়াণের সংবাদে হাসপাতালের করিডোরে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের সিনিয়র নেতারা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
রাজনীতির এক মহাকাব্যিক যাত্রা:- ১৯৪৫ সালে জন্ম নেওয়া খালেদা খানম ‘পুতুল’ থেকে হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। ১৯৮১ সালে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর ঘরোয়া রাজনীতির আঙ্গিনা ছেড়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দলের হাল ধরেছিলেন তিনি। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা ছিল কণ্টকাকীর্ণ, কিন্তু তিনি ছিলেন অবিচল। ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে-তিন মেয়াদে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি শিক্ষা, নারী উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সংস্কারে অভূতপূর্ব স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
দেশজুড়ে শোকের ছায়া:- দেশনেত্রীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই রাজপথ থেকে অলিগলি-সর্বত্র নেমে এসেছে স্তব্ধতা। সারা দেশের দলীয় কার্যালয়গুলোতে শোকের প্রতীক হিসেবে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে এবং দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। শোক বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁকে ‘গণতন্ত্রের পাহারাদার’ ও ‘জাতির অভিভাবক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
এক অপূরণীয় শূন্যতা:- বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে বাংলাদেশ হারাল তার ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী এবং জনপ্রিয় এক ব্যক্তিত্বকে। রাজনৈতিক মতভেদ ছাপিয়ে আজ সাধারণ মানুষের চোখেও অশ্রু। তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রী ছিলেন না, বরং কোটি মানুষের আবেগ ও আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। আগামী কাল বুধবার সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকায় যে নামগুলো স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, বেগম খালেদা জিয়া তাদের মধ্যে অন্যতম। ব্যক্তি খালেদা জিয়ার প্রয়াণ ঘটলেও, তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ এবং ‘আপসহীন’ নেতৃত্বের উদাহরণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরকাল উজ্জ্বল-অম্লানে অমর হয়ে থাকবে।