
১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মহান বিজয় দিবস। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ থেকে এ দিনে মুক্তি লাভ করে বাংলার মানুষ। এ বিজয় শুধু আনন্দের নয়; এটি পরাধীনতার কবল থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন সত্তা প্রতিষ্ঠার গৌরবময় অর্জন। পৃথিবীর সব ধর্ম ও দর্শনে স্বাধীনতার গুরুত্ব অপরিসীম। শান্তি ও মানবতার ধর্ম ইসলামেও স্বাধীনতা ও বিজয়কে মহান আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ইসলাম চায়, মানুষ যেন শান্তিপূর্ণ ও স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারে এবং নিজের ভূখণ্ড ও মাতৃভূমিকে ভালোবাসে। এ শিক্ষাই আমাদের প্রিয় রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.) দিয়েছেন।
দেশপ্রেম ও রাষ্ট্রের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা মুসলমানের চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রকৃত ঈমানদার কখনো রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে না। তাই বাংলাদেশের বিজয় দিবস আমাদের গৌরব ও অহংকার। ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ হলো—মানুষ মানুষের গোলামি করবে না; বরং একমাত্র তার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর গোলামি করবে। এই আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্যই আমাদের মাতৃভূমিকে স্বাধীন করতে দিতে হয়েছে লাখো শহীদের তাজা রক্ত।
ইসলামে দেশপ্রেম একটি স্বভাবজাত অনুভূতি। মুসলমানদের প্রতিটি রক্তকণিকায় দেশপ্রেমের শিহরণ থাকা কাম্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন দেশপ্রেমের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত। অত্যাচারী কাফেরদের নির্যাতনের কারণে যখন তিনি মাতৃভূমি মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করছিলেন, তখন অশ্রুসজল নয়নে মক্কার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন—হে মক্কা! আমি তোমাকে ভালোবাসি। যদি আমাকে জোরপূর্বক বের করে না দেওয়া হতো, তবে কখনো তোমাকে ত্যাগ করতাম না। হিজরতের পর মদিনাকেও তিনি গভীরভাবে ভালোবাসতেন। সফর থেকে ফেরার সময় ওহুদ পাহাড় চোখে পড়লে তিনি বলতেন, এই পাহাড় আমাদের ভালোবাসে এবং আমরাও একে ভালোবাসি।
দেশপ্রেমের বাস্তব প্রকাশ হলো দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় আত্মনিয়োগ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) সীমান্ত পাহারার ফজিলত বর্ণনা করে বলেছেন, আল্লাহর পথে একদিন ও একরাত পাহারা দেওয়া এক মাস সিয়াম ও এক মাস রাতভর ইবাদতের চেয়ে উত্তম। সত্যিকারের দেশপ্রেম মানুষকে দেশের উন্নয়ন, শৃঙ্খলা ও সমৃদ্ধির জন্য কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। তাই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করতে হবে।
ইসলামি ইতিহাসে বিজয়ের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হলো মক্কা বিজয়। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) উষ্ট্রীর ওপর আরোহিত অবস্থায় অত্যন্ত বিনয়ী ভঙ্গিতে নগরীতে প্রবেশ করেন। তিনি প্রথমে উম্মে হানির ঘরে গিয়ে আট রাকাত নফল নামাজ আদায় করেন, যা বিজয়ের নামাজ নামে পরিচিত। এরপর তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বলেন, আজ তোমাদের সবার জন্য ইউসুফ (আ.)-এর মতো ক্ষমা। এ ঘটনায় ইসলামের বিজয়ের প্রকৃত রূপ—ক্ষমা, উদারতা ও মানবতার প্রকাশ ঘটে।
কোরআনে কারিমে বিজয়ের দুটি রূপের কথা বলা হয়েছে। এক ধরনের বিজয় হলো সাম্রাজ্যবাদী ও স্বার্থনির্ভর বিজয়, যা জনপদ ধ্বংস করে এবং মানবতাকে বিপর্যস্ত করে। অন্যটি হলো কল্যাণকামী ও আদর্শবাদী বিজয়, যেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়, নামাজ ও জাকাত কায়েম হয় এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করা হয়। ইসলামের বিজয় দ্বিতীয় প্রকারের বিজয়—সত্য, ন্যায় ও মানবতার বিজয়।
বিজয় দিবসে মুসলমানের করণীয় সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা সুরা নাসরে বলেন, যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসে, তখন তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করতে হবে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। বিজয় ও স্বাধীনতা একমাত্র আল্লাহর দান। তাই এ দিনে মহান আল্লাহর দরবারে শোকরিয়া আদায়, নফল নামাজ পড়া, শহীদদের জন্য দোয়া ও ইস্তেগফার করা এবং কোরআন তেলাওয়াত করা ইসলামের শিক্ষা।
অতএব, মহান বিজয় দিবস আমাদের জন্য শুধু আনন্দের দিন নয়; এটি আত্মত্যাগ, কৃতজ্ঞতা, ঐক্য ও দায়িত্ববোধের স্মারক। ইসলামের আলোকে বিজয়ের চেতনাকে ধারণ করে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৫
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি
Leave a Reply