রমজান মাসে কোরআন মজীদ তেলাওয়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হলো তারাবি নামাজ। ইশার নামাজের পর বিরতি দিয়ে ২০ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা এই নামাজ আদায় করা হয়। বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে পড়া হয় বলেই এর নাম ‘তারাবি’, অর্থাৎ বিশ্রামের নামাজ।
তারাবি নামাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—হাফেজ ইমামরা নামাজে কোরআনের নির্দিষ্ট অংশ তেলাওয়াত করেন। এভাবে রমজানের শেষদিকে এসে সাধারণত ২৭ রমজানের রাতে পুরো কোরআন তেলাওয়াত সম্পন্ন হয়, যাকে বলা হয় ‘খতম তারাবি’। রোজা রেখে দিনের ক্লান্তি সত্ত্বেও গভীর রাতে দীর্ঘ তেলাওয়াতের মাধ্যমে মুসল্লিদের নিয়ে এই নামাজ আদায় করা সত্যিই এক অনন্য আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা।
রমজান মাসেই গভীর রাতে কোরআন নাজিল হয়েছিল। এই মহিমান্বিত রাতকে কোরআনে ‘লাইলাতুল কদর’ বা সম্মানিত রাত বলা হয়েছে, যা আমাদের সংস্কৃতিতে ‘শবে কদর’ নামে পরিচিত।
ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, রমজান মাসে প্রতি রাতে ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.) নবী মুহাম্মদ (সা.)–এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন এবং কোরআনের দৌর বা পারস্পরিক তেলাওয়াত করতেন। অর্থাৎ নবীজি জিবরাঈল (আ.)–কে এবং জিবরাঈল (আ.) নবীজি (সা.)–কে কোরআন পড়ে শোনাতেন। হাদিসে বর্ণিত আছে, এ সময় নবীজির দানশীলতা প্রবহমান বাতাসের চেয়েও দ্রুত ও ব্যাপক হয়ে উঠত।
এই ঐতিহ্যের অনুসরণেই রমজান মাসে মসজিদে তারাবি নামাজে কোরআন খতমের প্রচলন হয়েছে। এটি একদিকে সুন্নতের অনুসরণ, অন্যদিকে কোরআন নাজিলের স্মরণে এক বিশেষ ইবাদত।
তারাবি নামাজের মাধ্যমে কোরআন সংরক্ষণের এক অনন্য ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে তিনি নিজেই কোরআনের হেফাজত করবেন। বাস্তবে যুগে যুগে হাফেজরা কোরআন মুখস্থ রেখে সেই দায়িত্ব পালন করে আসছেন। কোনো জালিম শাসক যদি কোরআনের কপি নষ্ট করার চেষ্টা করেও থাকে, হাফেজদের হৃদয়ে সংরক্ষিত কোরআন কখনো বিলুপ্ত হয়নি।
বিশ্বের বহু দেশে যেমন, তেমনি বাংলাদেশেও অসংখ্য শিশু-কিশোর ছোটবেলা থেকে কোরআন মুখস্থ করে। রমজান মাসে তারাবি নামাজে কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমেই তারা তাদের মুখস্থ কোরআন পুনরায় চর্চা ও সংরক্ষণ করে। অনেক সময় কয়েক বছর তারাবিতে কোরআন তেলাওয়াতের সুযোগ না পেলে মুখস্থ অংশ দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এ কারণেই বলা হয়—হাফেজরা কোরআনের হেফাজতকারী হলেও তাদের হেফাজতকারী যেন তারাবি নামাজ।
কোরআনের আরেকটি বিশেষত্ব হলো—অনেকেই এর অর্থ পুরোপুরি না বুঝেও তা তেলাওয়াত করেন এবং মুখস্থ করেন। পৃথিবীতে কোরআনের মতো আর কোনো ধর্মগ্রন্থ নেই, যা এত ব্যাপকভাবে মানুষ মুখস্থ রাখে।
ইতিহাসে দেখা যায়, অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের মূল রূপ অনেক ক্ষেত্রে সংরক্ষিত নেই। যেমন ঈসা (আ.)–এর ওপর নাজিলকৃত ইনজিল বা মূসা (আ.)–এর ওপর নাজিলকৃত তাওরাত আজ হুবহু সেই আদি রূপে বিদ্যমান নেই। অন্যদিকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে যেভাবে কোরআন নাজিল হয়েছিল, মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী তা আজও অপরিবর্তিতভাবে সংরক্ষিত রয়েছে।
তবে শুধু তেলাওয়াতেই সীমাবদ্ধ না থেকে কোরআনের অর্থ বোঝা, গবেষণা করা এবং জীবনের পথে তা প্রয়োগ করাই মুসলমানদের প্রকৃত দায়িত্ব।







