চট্টগ্রাম বন্দরে পাঁচ দিনের লাগাতার ধর্মঘটে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। প্রতিদিন গড়ে শত শত কোটি টাকার ক্ষতির পাশাপাশি সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণ ইতোমধ্যে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বন্দর কার্যক্রম প্রায় সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ায় দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন কার্যত থমকে গেছে।
বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্দরের সঙ্গে যুক্ত ১৯টি প্রাইভেট আইসিডিতে রফতানিমুখী কনটেইনার জমেছে ১০ হাজার ৮১০টি এবং আমদানি কনটেইনার জমেছে প্রায় ৭ হাজার ৯০০টি। আইসিডিগুলোতে কাজের পরিমাণ কমে গেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। যেখানে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডলিং হতো, সেখানে এখন তা নেমে এসেছে ৫ থেকে ৬ হাজারে। এ ছাড়া অন্তত ১০ লাখ টন ভোগ্যপণ্য বড় জাহাজে বহির্নোঙরে ভাসমান অবস্থায় আটকা পড়েছে।
প্রাইভেট আইসিডিগুলোতে দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ ৭ থেকে ৮ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা)। পাশাপাশি বহির্নোঙরে ভাসমান অন্তত দেড় ডজন বড় জাহাজের ডেমারেজ বাবদ দৈনিক অর্ধকোটি টাকার বেশি ক্ষতি হচ্ছে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, “প্রতিদিন শত কোটি টাকার ক্ষতি তো হচ্ছেই। পাঁচ দিনের হিসাব ধরলেও ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই পড়বে। কারণ ডেমারেজসহ বাড়তি খরচ বাজারে পণ্যমূল্যের মাধ্যমে আদায় করা হবে।”
শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন জানান, চট্টগ্রাম বন্দরে রফতানি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাং, কলম্বো ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বন্দরে যাওয়া মাদার ভেসেলগুলো বাংলাদেশি রফতানি কনটেইনার না নিয়েই চলে যাচ্ছে। এতে দেশের ইমেজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠাতে না পারলে বিদেশি বায়াররা অর্ডার বাতিল করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
বর্তমানে বন্দরে ১০ হাজারের বেশি রফতানি পণ্যবাহী কনটেইনার আটকা রয়েছে, যার মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্পের পণ্য রয়েছে হাজার কোটি টাকারও বেশি। প্রয়োজনে বিমানযোগে পণ্য পাঠাতে হলে অতিরিক্ত এয়ারফ্রেইট ব্যয় ব্যবসায়ীদের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়াবে।
এদিকে কাস্টমস সূত্র জানিয়েছে, পণ্য ওঠানামা বন্ধ থাকায় বিল অব এন্ট্রি দাখিল কমে গেছে এবং রাজস্ব আদায়েও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরাও সংকটে পড়েছেন।
রমজান সামনে রেখে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বহির্নোঙরে ভাসমান জাহাজে থাকা ছোলা, খেজুর ও ফলমূলসহ নিত্যপণ্য দ্রুত খালাস করা না গেলে রমজানে বাজারে সংকট দেখা দেবে এবং দাম বেড়ে যাবে।
এনসিটি ইজারা ইস্যুতে লাগাতার কর্মবিরতি
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেওয়ার বিরোধিতায় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে বুধবার থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু হয়েছে। এর ফলে জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও এনসিটিতে সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বন্দর জেটি ও বহির্নোঙরে জাহাজের অপেক্ষার সময় বাড়ছে।
এর আগে শনিবার থেকে ধাপে ধাপে কর্মবিরতি পালন শুরু হয়। ইতোমধ্যে আন্দোলনে যুক্ত ১৬ জনকে বদলি করা হলেও তারা কাজে যোগ দেননি। পরিস্থিতি সামাল দিতে বন্দর কর্তৃপক্ষের নেওয়া পদক্ষেপেও কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়নি।
আন্দোলনকারী শ্রমিক নেতা ইব্রাহিম খোকন বলেন, “আমরা বন্দরের স্বার্থ রক্ষার জন্য আন্দোলন করছি। এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া বাতিল না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লাগাতার কর্মসূচি চলবে।”
চলমান অচলাবস্থায় দ্রুত সমাধান না হলে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য, শিল্পখাত ও ভোক্তা পর্যায়ে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয়