
লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে ফসলি জমির ওপর গড়ে উঠেছে ৫১টি ইটভাটা, যার মধ্যে বৈধ মাত্র দুটি। বাকি ৪৯টি ইটভাটা চলছে কোনো পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই। প্রশাসনের উদাসীনতা ও ‘খুশি রাখার সংস্কৃতি’র কারণে বছরের পর বছর অবৈধভাবে এসব ভাটা পরিচালিত হচ্ছে।
২০২৩ সালে রামগতিতে ইটভাটা ছিল ৪০টি, ২০২৪ সালে বেড়ে হয় ৪৯টি এবং চলতি ২০২৫ মৌসুমে নতুন করে প্রস্তুত হচ্ছে আরও দুটি। ফলে মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১টিতে। চর আফজল গ্রামেই রয়েছে ২৭টি, চর আলগীতে ৮টি, চর মেহারে ১৩টি, চর কলাকোপায় ১টি এবং চর পোড়াগাছায় ২টি ইটভাটা।
লক্ষ্মীপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হারুন অর রশিদ জানান, উপজেলার ৫১টি ইটভাটার মধ্যে বনলতা ও সরকার ব্রিকস—এই দুটি পরিবেশ ছাড়পত্র নিয়েছে, বাকি ৪৯টি অবৈধ। অবৈধ ভাটাগুলো বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী সব অবৈধ ইটভাটা অনতিবিলম্বে বন্ধের নির্দেশনা কার্যকর করা হবে। তিনি বলেন, এসব ভাটা পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও কৃষিজমির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হলেও অনেকে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কেবল ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে অবৈধভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. কামনাশিস মজুমদার বলেন, পরিবেশসম্মত না হলে ইটভাটার ধোঁয়া থেকে শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, ডায়াবেটিস, প্রেশার এমনকি ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। চর মেহার গ্রামের শিক্ষার্থী সাবিদ বলেন, বাড়ির পাশে ফসলি জমিতে ভাটা হওয়ায় ধুলো-বালিতে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, ঘরে বসবাসেরও উপযুক্ত পরিবেশ থাকে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অবৈধ ইটভাটাগুলো নতুন মৌসুমের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। কোথাও কাঁচা ইট প্রস্তুত শেষ পর্যায়ে, কোথাও আগুন জ্বালানোর অপেক্ষা। সব ভাটায় শত শত শ্রমিক কাজ করছে, তাদের মধ্যে শিশু শ্রমিকও রয়েছে। ফসলি জমির মাটি কেটে ইট তৈরির কারণে কৃষি উৎপাদন হুমকির মুখে পড়েছে। কৃষি বিভাগ বা বন বিভাগের কোনো তদারকি নেই।
চর আফজল গ্রামের কৃষক রফিক উদ্দিন বলেন, প্রশাসন অভিযান চালিয়ে কখনো জরিমানা করে, কখনো চিমনি ফেলে দেয়। কিন্তু বিকেলেই চিমনি আবার দাঁড়িয়ে যায়। ভাটাগুলোতে মাটি পরিবহনের জন্য ট্রাক্টর ও ট্রলি ব্যবহার করায় গ্রামীণ সড়ক ও জমি নষ্ট হচ্ছে। কার্পেটিং উঠে গিয়ে রাস্তা চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
চর রমিজ ইউনিয়নের বাসিন্দা ফারহাজ আহম্মেদ ও মো. মামুন জানান, ভাটাগুলোর উপকরণ পরিবহনে ভারী যানবাহন ব্যবহার করায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্মিত সড়কগুলো এক বছরের মধ্যেই ভেঙে পড়ছে। গত বছরও ভাটা বন্ধের কথা বলা হলেও একটি ভাটাও বন্ধ হয়নি।
এক ইটভাটা মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সবাইকে খুশি করেই ভাটা চালাতে হয়। উপজেলা ব্রিকস ফিল্ড মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছানাউল্যা জানান, অনেক ভাটা মালিক বৈধ কাগজপত্রের জন্য আবেদন করেছেন। তবে সংগঠনের সভাপতি খলিল উল্যাহ বৈধ চিমনি স্থাপন বা কাঠ পোড়ানো বন্ধের বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ আমজাদ হোসেন বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গত আগস্টে ইটভাটার এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে এবং নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। তিনি জানান, অনুমোদনহীন ইটভাটা বন্ধে সম্প্রতি এক সভায় সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনের পদক্ষেপ শুধু মাইকিং ও সভা-সমাবেশেই সীমিত, বাস্তবে কোনো অভিযান বা কঠোর ব্যবস্থা দেখা যায় না। ফলে রামগতির ফসলি জমি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য আজ অবৈধ ইটভাটার দখলে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৫
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি
Leave a Reply