খুলনা মহানগরীর খালিশপুর এলাকায় জাতীয়তাবাদী তাঁতীদলের এক স্থানীয় নেতাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। শনিবার (১১ এপ্রিল) রাত ১২টার দিকে নগরীর নয়াবাটি এলাকায় এই নৃশংস ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তির নাম মো. সোনামিয়া (জব্বার সরদারের ছেলে)। তিনি খালিশপুরের ১০ নম্বর ওয়ার্ড তাঁতীদলের আহ্বায়ক ছিলেন এবং স্থানীয়ভাবে একজন ব্যবসায়ী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
ঘটনার পর স্থানীয়রা গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে নিকটস্থ একটি ক্লিনিকে নিয়ে যান। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার সময় সোনামিয়া তার নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অবস্থান করছিলেন। রাত প্রায় ১২টার দিকে মোটরসাইকেলে করে তিনজন দুর্বৃত্ত সেখানে আসে। তাদের মধ্যে দু’জন মুখোশ পরিহিত ছিল এবং একজন হেলমেট পরে ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। তারা সরাসরি দোকানের ভেতরে প্রবেশ করে এবং কোনো কথা না বলেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে সোনামিয়ার ওপর এলোপাতাড়ি হামলা চালায়।
হামলার পর প্রাণ বাঁচাতে তিনি পাশের একটি বাসায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে হামলাকারীরা সেখানে গিয়ে তাকে পুনরায় আক্রমণ করে গুরুতর জখম করে। ঘটনাস্থলে মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং আশপাশের লোকজন ছুটে এলে হামলাকারীরা দ্রুত মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়।
স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে গেলেও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও গুরুতর আঘাতের কারণে তার মৃত্যু হয় বলে চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও শোকের সৃষ্টি করেছে।
নিহত মো. সোনামিয়া খালিশপুর এলাকার জব্বার সরদারের ছেলে। তিনি স্থানীয়ভাবে ব্যবসার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১০ নম্বর ওয়ার্ড তাঁতীদলের আহ্বায়ক হিসেবে তিনি সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। তার মৃত্যুতে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
১০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আব্দুল হাই কালু এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “জাতীয়তাবাদী তাঁতীদলের আহ্বায়ক সোনামিয়াকে তার নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করেছে। এটি অত্যন্ত নিন্দনীয় ঘটনা। আমরা দ্রুত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।”
খালিশপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) পলাশ কুমার রায় জানান, ঘটনার খবর রাত সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশকে জানানো হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
তিনি আরও জানান, “স্থানীয়রা আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। আমরা প্রাথমিক সুরতহাল রিপোর্ট সম্পন্ন করেছি এবং তদন্ত চলছে।”
খালিশপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. তৌহিদুজ্জামান বলেন, মরদেহ বর্তমানে হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার সুদর্শন কুমার রায় জানান, হত্যাকাণ্ডের কারণ উদঘাটনে পুলিশের একাধিক টিম কাজ শুরু করেছে। জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চলছে।
এ হত্যাকাণ্ডের পর খালিশপুর এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, প্রকাশ্য এলাকায় এ ধরনের হামলা স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। হামলাকারীদের শনাক্ত করতে প্রযুক্তিগত সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে।
ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়।
খালিশপুরে এই হত্যাকাণ্ড খুলনা নগরীর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একজন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় এলাকায় শোক, আতঙ্ক এবং ক্ষোভ বিরাজ করছে। পুলিশ দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনার রহস্য উদঘাটন ও অপরাধীদের গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিয়েছে।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু অনুমতি ছাড়া ব্যবহারযোগ্য নহে