
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি নিয়ে পরিকল্পনা করেছিলেন তারেক রহমান। সরকার গঠনের পরপরই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেন তিনি। গত মার্চে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এ কর্মসূচি পরে দেশজুড়ে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ, কর্মী নিয়োগ, উপকারভোগী নির্বাচন এবং প্রশাসনিক সমন্বয় নিয়ে নানা অসংগতি ও জটিলতার অভিযোগ উঠেছে।
কর্মসূচি বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে কয়েকটি এলাকায় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরোধ, হট্টগোল এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মীদেরও এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। চাপের মুখে পড়েছেন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারাও।
সমাজ বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্যামিলি কার্ড একটি সম্ভাবনাময় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি হলেও এর সফল বাস্তবায়নে উপকারভোগী নির্বাচন, অর্থায়ন, তথ্যের নির্ভুলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং সেবা প্রদানের প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করা জরুরি। তাঁদের পরামর্শ, প্রকল্পের পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি পরিকল্পনা, জবাবদিহি ও প্রযুক্তির ব্যবহার আরও জোরদার করতে হবে।
সরকারের অন্যতম প্রধান উদ্যোগ ফ্যামিলি কার্ডের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয় গত ১০ মার্চ। সেদিন রাজধানীর বনানীর কড়াইলে নারীপ্রধান পরিবারগুলোর জন্য কর্মসূচিটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, নারীর ক্ষমতায়নের অংশ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারায় তিনি ব্যক্তিগতভাবে আবেগাপ্লুত। একই সঙ্গে দিনটিকে তাঁর সরকার ও বিএনপির জন্য ঐতিহাসিক ও আবেগের বলে উল্লেখ করেন।
কর্মসূচির প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্বাচিত পরিবারের একজন নারী সদস্য মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে বছরে ৩০ হাজার টাকা ডিজিটাল পদ্ধতিতে সহায়তা পাবেন। প্রথম পর্যায়ে ৪১ লাখ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। উপকারভোগী নির্বাচনে হালনাগাদ প্রক্সি-মিনস টেস্টিং (পিএমটি), স্থানীয় পর্যায়ে যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি কোনো পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হলে তাদের কর্মসূচি থেকে বের করে নতুন যোগ্য পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
পাইলট প্রকল্পের পর ১৬ আগস্ট কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার লতিফাবাদ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে কর্মসূচিটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরবর্তী চার বছরে ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা, ২০২৬’ অনুযায়ী, হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে সরকার-থেকে-ব্যক্তি (জিটুপি) পদ্ধতিতে মাসিক নগদ সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে কর্মসূচির পরিসর বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে বিভ্রান্তি এবং অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে।
ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। কোথাও নিয়োগ বাতিলের দাবিতে হট্টগোল হয়েছে, কোথাও সরকারি কার্যালয় ঘেরাও ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। কিছু ঘটনায় কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। পরিস্থিতির চাপে কয়েকটি স্থানে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সময়ের আলোকে বলেন, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পর্যাপ্ত পরামর্শ ছাড়াই বড় একটি কর্মসূচির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক অসহযোগিতার কারণে কাজ করতে গিয়ে তাঁদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের শুরু থেকে বিভিন্ন ধাপে চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়েছে। কিছু এলাকায় নিয়োগসংক্রান্ত পরীক্ষা বাতিল হয়েছে, আবার কোথাও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও সম্পন্ন করা যায়নি। কর্মকর্তাদের নাজেহাল করার ঘটনার পরও তাঁদেরই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ায় মাঠ প্রশাসনের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
সরকারি নীতিমালায় অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত পরিবারের বৈশিষ্ট্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার, প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছেন এমন পরিবার এবং হিজড়া, বেদে ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবার। এ ছাড়া শূন্য দশমিক ৫ একর বা তার কম জমির মালিক পরিবারকে সুবিধার আওতায় আনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আট শ্রেণির মানুষকে কর্মসূচির বাইরে রাখার বিধান রয়েছে।
গত ১২ অক্টোবর সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানান, দেশব্যাপী ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য পরিবারের তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে সরকার। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আনুমানিক ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করে একটি ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ তথ্যের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে যোগ্য নারী পরিবারপ্রধানদের কার্ড ও ভাতা দেওয়া হবে।
মন্ত্রী জানান, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পাইলট কার্যক্রমে দেশের আট বিভাগের ৪৪টি জেলার ৫৫টি উপজেলা এবং সিটি করপোরেশনের ৫৭টি ইউনিটে ১ লাখ ১২ হাজার ৯৪টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে পিএমটি স্কোরের ভিত্তিতে নির্বাচিত ৭১ হাজার ৮৩১ জন উপকারভোগীকে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতা দেওয়া হয়েছে।
পাইলট প্রকল্পে ৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৬৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৫৭ কোটি ২০ লাখ টাকা ভাতা হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সমাজকল্যাণমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে নতুন করে ৪০ লাখ নারী পরিবারপ্রধানকে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। পরবর্তী তিন অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে যোগ্য সব নারী পরিবারপ্রধানকে কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে অনিয়ম ও সমালোচনার বিষয়ে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল সময়ের আলোকে বলেন, কর্মসূচিতে কিছু অসংগতি শনাক্ত হয়েছে। কোনো অভিযোগ বা তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য। সে অনুযায়ী তালিকা সংশোধনের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমিয়ে সরাসরি সুবিধাভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। শুধু ভাতা প্রদান নয়, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে স্বাবলম্বী করে তোলাও সরকারের পরিকল্পনার অংশ।
প্রতিমন্ত্রীর মতে, সরকারের এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বাধা রয়েছে। তাঁর দাবি, কর্মসূচি নিয়ে কিছু সমালোচনা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হচ্ছে।
সমাজ বিশ্লেষক ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফখরুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, ফ্যামিলি কার্ড একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হলেও এর বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশাসনের অসহযোগিতা, স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, স্বজনপ্রীতি, বিশৃঙ্খলা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা, প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা এবং তথ্যগত ভুল এ কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করতে পারে।
এসব সমস্যা দূর করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, মাঠ প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
সামাজিক সুরক্ষা ও ডিজিটাল গভর্ন্যান্স বিশেষজ্ঞ আমিনুল মোহায়মেন মনে করেন, ফ্যামিলি কার্ডকে ধীরে ধীরে পরিবারভিত্তিক একটি সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা প্ল্যাটফর্মে রূপ দেওয়া সম্ভব। তাঁর মতে, এর আওতায় দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার, নারী ও শিশু, খাদ্যনিরাপত্তা এবং পুষ্টিসংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মসূচি একীভূত করা যেতে পারে।
সব পরিবারকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হলেও নগদ সহায়তা দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য নির্ধারিত থাকতে পারে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য, মাতৃত্বকালীন ও শিক্ষা সহায়তা যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকারভোগী নিবন্ধন, তথ্য যাচাই, অর্থ বিতরণ, জনসচেতনতা তৈরি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রতিটি ধাপে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে অনেক সমস্যা কমানো সম্ভব। পাশাপাশি দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় এবং স্বচ্ছ নির্বাচনপ্রক্রিয়া গড়ে তোলাও জরুরি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে বৈশ্বিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ প্রেক্ষাপটে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে।
তবে কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করবে প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্ত করা, অনিয়ম প্রতিরোধ, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং সহায়তা সময়মতো মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর। তাই ফ্যামিলি কার্ডের পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের অসংগতি দূর করা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।