
বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই নতুন ঋণচুক্তি সম্পন্ন করা। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম কিস্তির অর্থ ছাড় হতে পারে।
তবে এবার ঋণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংস্কারই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। পাঁচ দিনের ঢাকা সফর শেষে আইএমএফ জানিয়েছে, নতুন কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাতে দ্রুত সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন।
অন্যদিকে সরকার জানিয়েছে, জনস্বার্থ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সংস্কার কার্যক্রম ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
আইএমএফের আগের ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। এরপর নতুন সরকার নতুন বাস্তবতায় নতুন ঋণ কর্মসূচির প্রস্তাব দেয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন ঋণের অর্থ শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতেই নয়, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন সহজ করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
১২ থেকে ১৬ জুলাই আইএমএফের বাংলাদেশ মিশনের প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে। এসব বৈঠকে সংস্থাটি পাঁচটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়—রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাতের দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার।
আইএমএফের মতে, প্রবাসী আয় ইতিবাচক থাকলেও বৈদেশিক খাতের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থাপনা এবং কম রাজস্ব আহরণ বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ, যা সরকারের ৬ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, প্রয়োজনীয় রাজস্ব ও ব্যাংকিং সংস্কার বাস্তবায়িত না হলে মধ্যমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশেরও নিচে নেমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে থাকলে নতুন কর্মসংস্থান কমে যায়, শিল্পে বিনিয়োগ হ্রাস পায় এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও ভোগ ব্যয় সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম নিম্ন হওয়ায় রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থার মতে, শুধু করের হার বাড়ানো নয়, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, করের আওতা বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ এবং ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও জরুরি।
ব্যাংকিং খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএমএফ। খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংক পরিচালনা, মূলধন ঘাটতি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সুশাসনের অভাব দূর করতে দ্রুত ও কার্যকর সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। প্রয়োজনে দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন বা একীভূত করার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ বাড়ছে বলে মনে করছে আইএমএফ। এ পরিস্থিতিতে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখা এবং বাজারভিত্তিক ডলার বিনিময় হার নিশ্চিত করতে ‘ক্রলিং পেগ’ ব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, নতুন ঋণ কর্মসূচির ভিত্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে সংস্কার বাস্তবায়ন হবে সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী এবং ধাপে ধাপে। একসঙ্গে কঠোর সব শর্ত বাস্তবায়ন করলে অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সূত্র জানায়, জুলাইয়ের বৈঠকের পর আগামী কয়েক মাস আইএমএফের সঙ্গে একাধিক ভার্চ্যুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। অক্টোবর মাসে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর নভেম্বরে আইএমএফের আরেকটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করতে পারে।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ডিসেম্বরের মধ্যেই নতুন ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে এবং ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম কিস্তির অর্থ ছাড়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন ঋণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন। রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে নতুন ঋণের সুফল দীর্ঘমেয়াদে পাওয়া কঠিন হবে। আইএমএফও স্পষ্ট করেছে, তাদের প্রধান গুরুত্ব ঋণের পরিমাণ নয়; বরং সংস্কারের গতি, বাস্তবায়ন এবং বিশ্বাসযোগ্যতা।