
মহান আল্লাহ মানবজাতির হেদায়েত, কল্যাণ ও মুক্তির জন্য সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় রাসুলের জীবনে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব : ২১)। তাই একজন মুমিনের জীবনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শের চেয়ে বড় কোনো অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে না।
ইসলামপূর্ব আরব সমাজে যখন নানা ধরনের সামাজিক অনাচার, কুসংস্কার, হিংসা, গোত্রীয় সংঘাত ও অবিচার বিরাজ করছিল, তখন মহানবী (সা.) তাওহিদ, ন্যায়, শান্তি, মানবিকতা ও নৈতিকতার বার্তা নিয়ে আবির্ভূত হন। তাঁর জীবন ছিল সততা, আমানতদারি, ক্ষমা, ধৈর্য, সহনশীলতা, দয়া ও মানুষের প্রতি সম্মানের অনন্য দৃষ্টান্ত।
মহানবী (সা.) ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কার কুরাইশ গোত্রের বনি হাশেম বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আবদুল্লাহ এবং মা আমিনা। জন্মের আগেই তিনি পিতাকে হারান। ছয় বছর বয়সে মা এবং আট বছর বয়সে দাদা আবদুল মুত্তালিবকে হারান। এরপর চাচা আবু তালিবের আশ্রয়ে তিনি বেড়ে ওঠেন।
শৈশবের একটি সময় তিনি বনি সাদ গোত্রে ধাত্রী হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর কাছে লালিত-পালিত হন। সেখানে তিনি অন্য শিশুদের সঙ্গে বেড়ে ওঠেন এবং ছাগল চরানোর কাজও করেন। পরবর্তী সময়ে চাচা আবু তালিবের সঙ্গে ব্যবসায়িক কাজে অংশ নেন।
যৌবনে তাঁর সততা ও বিশ্বস্ততার খ্যাতি মক্কায় ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ তাঁকে ‘আল-আমিন’ ও ‘আস-সাদিক’ হিসেবে সম্মান করত। অন্যায় ও সংঘাতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তিনি ‘হিলফুল ফুজুল’ নামের একটি সামাজিক উদ্যোগে যুক্ত হন। এর লক্ষ্য ছিল নির্যাতিতের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায় প্রতিরোধ এবং সমাজে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা।
কাবা শরিফ পুনর্নির্মাণের সময় হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে কুরাইশদের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে মহানবী (সা.) বিচক্ষণতার সঙ্গে তা মীমাংসা করেন। তিনি একটি চাদরের ওপর পবিত্র পাথরটি রেখে বিভিন্ন গোত্রের নেতাদের সেটি বহন করতে বলেন এবং পরে নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদ যথাস্থানে স্থাপন করেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত একটি সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মহানবী (সা.) খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসায়িক দায়িত্ব গ্রহণ করে তাঁর সততা ও দক্ষতার পরিচয় দেন। পরে খাদিজা (রা.)-এর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁদের দাম্পত্য জীবন ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও ভালোবাসার দৃষ্টান্ত।
৪০ বছর বয়সে হেরা গুহায় ধ্যানরত অবস্থায় তাঁর ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়। ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুরা আলাকের প্রথম আয়াতগুলো নিয়ে আসেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁর নবুওয়তের সূচনা হয়।
নবুওয়ত লাভের পর মহানবী (সা.) প্রথমে নিকটজনদের ইসলামের দাওয়াত দেন। পরে আল্লাহর নির্দেশে প্রকাশ্যে তাওহিদ ও ইসলামের শান্তি ও ন্যায়ের বার্তা প্রচার শুরু করেন। তাঁর দাওয়াতের অন্যতম বিষয় ছিল এক আল্লাহর ইবাদত, সত্যবাদিতা, ন্যায়বিচার, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং অন্যায়, জুলুম, প্রতারণা ও অনাচার থেকে বিরত থাকা।
ইসলামের প্রচার শুরু হওয়ার পর মহানবী (সা.) ও তাঁর অনুসারীদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন চালানো হয়। কিন্তু তিনি ধৈর্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যান। মক্কায় দীর্ঘ সময় প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি মানুষের প্রতি সহনশীলতা ও ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
নবুওয়তের দশম বছরে তাঁর স্ত্রী খাদিজা (রা.) ও চাচা আবু তালিবের মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে শোকাহত করে। এরপর তিনি তায়েফে ইসলামের দাওয়াত দিতে গেলে সেখানকার লোকদের বিরোধিতার মুখে পড়েন এবং আহত হন। তবুও তিনি তাদের জন্য শাস্তির বদলে কল্যাণ কামনা করেন।
এরপর মহানবী (সা.)-এর জীবনে ইসরা ও মেরাজের ঘটনা ঘটে। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, এ সফরে তিনি মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা এবং সেখান থেকে ঊর্ধ্বলোকে গমন করেন। এ সফরের সঙ্গে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কিত।
মক্কার নির্যাতন ও বিরোধিতা বাড়তে থাকলে মহানবী (সা.)-এর নির্দেশে সাহাবিরা মদিনায় হিজরত করেন। পরে তিনি হজরত আবু বকর (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় পৌঁছে তিনি মসজিদে কুবা ও মসজিদে নববি প্রতিষ্ঠা করেন এবং মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে তোলেন।
মদিনায় তিনি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে একটি লিখিত চুক্তি প্রণয়ন করেন, যা ‘মদিনা সনদ’ নামে পরিচিত। এতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা, পারস্পরিক দায়িত্ব ও মদিনার নিরাপত্তার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মদিনা পর্বে মুসলমানদের সঙ্গে মক্কার বিরোধীদের একাধিক সংঘাত হয়। বদর, উহুদ ও খন্দকের মতো যুদ্ধে মুসলমানরা অংশ নেয়। বদর যুদ্ধে বিজয়ের পর মহানবী (সা.) যুদ্ধবন্দীদের সঙ্গে মানবিক আচরণের নির্দেশ দেন। শিক্ষিত বন্দীদের মাধ্যমে মুসলিম শিশুদের শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয় বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
ষষ্ঠ হিজরিতে মহানবী (সা.) সাহাবিদের নিয়ে ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে যাত্রা করলে হোদায়বিয়ায় কোরাইশদের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি হয়। চুক্তির কিছু শর্ত মুসলমানদের জন্য কঠিন মনে হলেও পরবর্তী সময়ে এর মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয় এবং ইসলামের দাওয়াত বিস্তারের সুযোগ বৃদ্ধি পায়।
হোদায়বিয়ার সন্ধি ভঙ্গের পর অষ্টম হিজরিতে মহানবী (সা.) মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হন। মক্কায় প্রবেশের পর তিনি সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দেন। কাবা শরিফ থেকে মূর্তি অপসারণ করা হয় এবং মক্কাকে পবিত্র ও নিরাপদ নগর হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
দশম হিজরিতে মহানবী (সা.) বিদায় হজ পালন করেন। এ সময় তিনি আরাফাতের ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। সেখানে মানুষের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদার নিরাপত্তা, নারীর অধিকার, পারস্পরিক দায়িত্ব এবং সাম্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্দেশনা দেন। তাঁর বিদায় হজের ভাষণ মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে মুসলিম সমাজে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
বিদায় হজের পর মহানবী (সা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতার মধ্যেও তিনি নামাজের প্রতি গুরুত্ব দেন এবং সাহাবিদের বিভিন্ন বিষয়ে নির্দেশনা দেন। অবশেষে ১১ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসে, ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে, ৬৩ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন শুধু ধর্মীয় ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; তাঁর জীবন মুসলমানদের জন্য নৈতিকতা, সততা, ন্যায়, ক্ষমা, সহমর্মিতা, মানবিকতা ও শান্তির আদর্শ। পবিত্র কোরআনের ভাষায়, তাঁর জীবনে রয়েছে উত্তম আদর্শ। তাই তাঁর শিক্ষা ও জীবনাদর্শ অনুসরণ করাকে মুসলমানরা নিজেদের ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন।