ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির কারণে বাংলাদেশকে প্রতি বছর শত শত মিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে সরকারের জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি (এনআরসি)। কমিটির মতে, এই চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে দেশের জাতীয় অর্থনীতি, শিল্পখাত ও রাজস্ব স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন–২০১০ এর আওতায় সম্পাদিত চুক্তিসমূহ পর্যালোচনা বিষয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
কমিটি জানায়, বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন জরুরি আইনের প্রয়োগের ফলে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ও স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। এর সুযোগে কয়েকটি বড় চুক্তিতে অতিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ঝুঁকি একতরফাভাবে রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পর্যালোচনা কমিটির তথ্যমতে, আদানি পাওয়ারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম অন্যান্য উৎসের তুলনায় ৪ থেকে ৫ সেন্ট বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। চুক্তির শুরুতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ছিল ৮ দশমিক ৬১ সেন্ট, যা বিভিন্ন শর্তের কারণে ২০২৫ সালে বেড়ে ১৪ দশমিক ৮৭ সেন্টে পৌঁছেছে। এর ফলে বাংলাদেশকে বছরে অতিরিক্ত ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে হচ্ছে।
কমিটি সতর্ক করে জানায়, চুক্তিটি বহাল থাকলে আগামী ২৫ বছর ধরে এই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হবে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন ব্যয়ের সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় কমিটির সদস্য ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ২০১১ থেকে ২০২৪ অর্থবছরের মধ্যে স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদকদের প্রতি সরকারের পরিশোধ ১১ গুণ বেড়েছে, অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র চার গুণ। এর ফলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান দিচ্ছে এবং ২০২৫ অর্থবছরে এর বকেয়া দায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এই ঘাটতি পুষিয়ে নিতে পাইকারি বিদ্যুতের দাম ৮৬ শতাংশ বাড়াতে হলে বাংলাদেশের বিদ্যুতের দাম ভারত, চীন, ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় বেশি হয়ে যাবে। এতে রফতানি ও বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাতীয় কমিটি জানায়, আর্থিক চাপ সামাল দিতে গিয়ে বিদ্যুতের দাম আরও বাড়ানো হলে দেশের শিল্পখাত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, আদানি পাওয়ারের সঙ্গে করা চুক্তিতে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে আদানিকে জানিয়ে তাদের ব্যাখ্যা চাওয়া উচিত। এরপর দ্রুত সিঙ্গাপুরে চুক্তি সংক্রান্ত সালিশি মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিলম্ব হলে আইনি কারণে বাংলাদেশের মামলা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে লন্ডনের বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন—এত শক্ত তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দুর্নীতি মামলায় খুবই বিরল।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয়