
স্যাটেলাইট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) এয়ার ট্রাফিক কমিউনিকেশন সিস্টেম, যার মাধ্যমে দেশের বিমানবন্দরগুলোর সার্বিক অপারেশন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বর্তমানে বিকল্প হিসেবে ফাইবার অপটিক্যাল কেবলের ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করে এয়ার ট্রাফিক কমিউনিকেশন চালু রাখা হয়েছে। তবে এই ফাইবার অপটিক্যাল কেবলে কোনো ধরনের সমস্যা দেখা দিলে বিমানবন্দরের অপারেশন কার্যক্রম মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিষয়টিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ফাইবার অপটিক্যাল কেবল মূলত ব্যাকআপ সংযোগ হিসেবে ব্যবহারের কথা থাকলেও বর্তমানে সেটিই প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তারা বলছেন, কোনো কারণে এই কেবলে সমস্যা দেখা দিলে দেশের বিমানবন্দরগুলোর অপারেশন কার্যক্রমে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। তাই দ্রুত স্যাটেলাইট সংযোগ পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা আরও উল্লেখ করেন, বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের ক্ষেত্রে এয়ার ট্রাফিক কমিউনিকেশন সিস্টেমের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকতে হয়। বর্তমানে স্যাটেলাইট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় ব্যাকআপ ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্যক্রম চালানো হলেও প্রশ্ন উঠছে—এই ব্যাকআপ দিয়ে আর কতদিন নিরাপদভাবে কার্যক্রম চালানো সম্ভব। ফাইবার অপটিক্যাল কেবলে প্রায়ই সমস্যা দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ কোনো ত্রুটি হলে বিমানবন্দর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই দেশের স্বার্থে দ্রুত এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট—এটিএম) এয়ার কমোডর নূর ই আলম বলেন, বাংলাদেশ স্যাটেলাইটে জ্যামিংয়ের কারণে এই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। সমস্যার নির্দিষ্ট উৎস এখনো চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, এটি মূলত বাংলাদেশ স্যাটেলাইট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয় এবং তারাই সমাধান করবে। এ কারণে বেবিচকের পক্ষ থেকে বর্তমানে কোনো ধরনের অপারেশনাল সমস্যা হচ্ছে না এবং বিমানবন্দরগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই পরিচালিত হচ্ছে।
এদিকে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) জানিয়েছে, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর এয়ার ট্রাফিক কমিউনিকেশনে ব্যবহৃত স্যাটেলাইট সংযোগে সাময়িক প্রতিবন্ধকতার কারণে নির্ধারিত স্পেকট্রামে সমস্যা দেখা দিয়েছে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বিটিআরসি সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক সরকারি স্মারকে এ তথ্য জানানো হয়।
বিটিআরসির স্পেকট্রাম মনিটরিং শাখার তথ্যমতে, ক্যাবের এয়ার ট্রাফিক কমিউনিকেশনের জন্য স্থাপিত ভিস্যাট সিস্টেমে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) বিএস-১ স্যাটেলাইটের জন্য বরাদ্দকৃত ৪৫৪০–৪৫৪৬ মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডে অপ্রত্যাশিত সিগন্যালের কারণে ইন্টারফিয়ারেন্স সৃষ্টি হয়। বিষয়টি জানার পর বিএসসিএল-এর পত্রের প্রেক্ষিতে বিটিআরসি প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান ও পরিবীক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে।
স্মারকে উল্লেখ করা হয়, সমস্যার উৎস শনাক্ত ও সমাধানের লক্ষ্যে গত ২০ অক্টোবর বিটিআরসি ও বিএসসিএল-এর যৌথ তরঙ্গ পরিবীক্ষণ দল মাঠপর্যায়ে স্পেকট্রাম মনিটরিং চালায়। এ সময় স্পেকট্রাম অ্যানালাইজারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সিতে খুব স্বল্প সময়ের জন্য দুটি আলাদা ফ্রিকোয়েন্সির পিক শনাক্ত করা হয়। তবে সেগুলো স্থিতিশীল না হওয়ায় এবং খুব অল্প সময়ের জন্য উপস্থিত থাকায় প্রকৃত উৎস নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে বিটিআরসি সুপারিশ করেছে, ক্যাব কর্তৃক ব্যবহৃত বর্তমান ভিস্যাট সিস্টেমের তরঙ্গ ব্যান্ড পরিবর্তন করে ভিন্ন একটি ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ড বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। এতে ভবিষ্যতে এয়ার ট্রাফিক কমিউনিকেশনে এ ধরনের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হবে এবং বিমান চলাচলসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ নির্বিঘ্ন রাখা যাবে।
প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এ সংক্রান্ত পত্রটি ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি অবগতির জন্য বেবিচকের চেয়ারম্যান, বিএসসিএল-এর সংশ্লিষ্ট মহাব্যবস্থাপক এবং বিটিআরসি চেয়ারম্যানের একান্ত সচিবকেও অনুলিপি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথিতে ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ এবং ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ তারিখ উল্লেখ রয়েছে। সর্বশেষ নোটে ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে উপসহকারী পরিচালক মো. দাউদ খান মজলিশের স্বাক্ষর সংযুক্ত রয়েছে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৫
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি
Leave a Reply