
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ এখন এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে। এবারের নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রথাগত প্রক্রিয়া নয়, বরং রাষ্ট্রের জরাজীর্ণ কাঠামো ভেঙ্গে নতুন করে গড়ার এক ‘অগ্নিপরীক্ষা’। গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ১৬ কোটি মানুষ এখন ব্যক্তি পরিবর্তনের চেয়ে পদ্ধতি পরিবর্তনের পক্ষে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার।
১. কাঠামোগত সংস্কারে বিচার বিভাগ সহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা:- ২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নাগরিক সমাজের প্রধান দাবি হলো একটি স্বাধীন ও প্রভাবমুক্ত বিচার বিভাগ। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমিক-সবার মাঝেই রাষ্ট্র সংস্কারের একটি সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে।
* আইন ও বিচারিক অবকাঠামোর পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা:- বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে বিচারকদের নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা আনার বিষয়টি এখন আলোচনার তুঙ্গে।
* শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন:- নির্বাচন কমিশনকে একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী সাংবিধানিক রূপ দান করা, যাতে কোনো বিশেষ সরকারের অধীনে কমিশনকে মেরুদণ্ডহীন হতে না হয়।
* বিকেন্দ্রীকরণ:- ঢাকা কেন্দ্রিক প্রশাসন থেকে বের হয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করা।
২. অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সিন্ডিকেটমুক্ত বাজার ব্যবস্থা:- ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনরুদ্ধারই হবে আগামী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ডলার সংকট, ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা এবং ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেতে মানুষ একটি দূরদর্শী সরকারের প্রত্যাশা করছে।
* সিন্ডিকেট নির্মূল:- দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে বাজার সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দিয়ে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
* মেধাভিত্তিক সুযোগ প্রদান:- তরুণ প্রজন্মের জন্য মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থান ও স্টার্টআপ বান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন। তরুণ উদ্যোক্তাদের মতে, “আমরা চাই এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে মেধার মূল্যায়ন হবে এবং ব্যবসার পরিবেশ হবে ভয়মুক্ত।”
৩. রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপান্তর ও সহিষ্ণুতা:- এই নির্বাচনের সফলতার বড় মাপকাঠি হলো রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা দূর করা। সাধারণ মানুষ চাই সংসদের ভেতর ও বাইরে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের মধ্যে একটি কার্যকর ও সম্মানজনক সম্পর্ক।
* অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি:- প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়াই এখন সময়ের মূল চাবিকাঠি।
* গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিপক্কতা:- নির্বাচনী মাঠে থাকা দলগুলো যদি পরাজিত হয়েও ফলাফল মেনে নেওয়ার মানসিকতা দেখায়, তবেই বাংলাদেশের গণতন্ত্র দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তি পাবে।
সর্বপরি, সম্মিলিত সকলের সদিচ্ছা-ই একমাত্র সমাধানের সুস্পষ্টত পথরেখা:- ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি তারিখ নয়, বরং ১৬ কোটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের মাইলফলক। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের পর যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, কাঠামোগত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন না করলে আবারও রাজনৈতিক সংকটের সৃষ্টি হতে পারে। প্রশাসন, রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ জনতা-এই ত্রয়ীর সম্মিলিত সদিচ্ছা-ই পারে একটি সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ উপহার দিতে। তাই, আগামীর আধুনিক বাংলাদেশের স্লোগান এটাই হোক – “সদিচ্ছা ও সংস্কার-ই সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার একমাত্র চাবিকাঠি।”
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয়
Leave a Reply