
দখলকৃত পশ্চিম তীরের প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনি আগামী ২৭ অক্টোবরের ইসরায়েলি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। অথচ তাদের বসবাস, চলাচল, বাড়িঘর নির্মাণ ও পানির সংস্থানসহ দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। অন্যদিকে, পশ্চিম তীর ও দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমের ইসরায়েলি বসতিগুলোতে বসবাসকারী প্রায় সাত লাখ ইহুদি বসতি স্থাপনকারী নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন।
আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জেরুজালেমের পূর্বদিকে অবস্থিত জাবাল আল-বাবা নামের একটি ছোট বেদুইন জনপদে ফিলিস্তিনিদের জীবন নানা বিধিনিষেধের মধ্যে চলছে। সেখানে বাড়ি নির্মাণ, পানির ব্যবস্থা করা কিংবা অবাধে চলাচলের ক্ষেত্রেও বাসিন্দাদের বিভিন্ন বাধার মুখে পড়তে হয়।
জনপদটির কমিউনিটি প্রতিনিধি আতাল্লাহ আল-জাহালিন বলেন, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনিদের এমনভাবে বিবেচনা করে, যেন তাদের কোনো অস্তিত্বই নেই। তার ভাষায়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকদের যেসব অধিকার থাকার কথা, সেগুলো থেকেও তারা বঞ্চিত।
প্রায় ৪৫০ মানুষের বসবাস জাবাল আল-বাবায়। পশ্চিম তীরের ‘এরিয়া সি’ অঞ্চলে অবস্থিত এই জনপদ। পশ্চিম তীরের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকাজুড়ে থাকা এরিয়া সিতে ইসরায়েলের সামরিক ও বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
জনপদটির অধিকাংশ বাসিন্দা জাহালিন গোত্রের সদস্য। তাদের অনেকেই ঢেউটিনের ঘরে বসবাস করেন এবং ভেড়া-ছাগল পালন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। ১৯৪৮ সালের নাকবা এবং পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের হাতে বাস্তুচ্যুত হয়ে তাদের পরিবারের সদস্যরা নাকাব বা নেগেভ মরুভূমি অঞ্চল ছেড়ে আসতে বাধ্য হন।
আল-জাহালিনের অভিযোগ, এলাকায় বাড়ি নির্মাণ, রাস্তা তৈরি কিংবা স্কুল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের চাপের পাশাপাশি বারবার উচ্ছেদ অভিযানের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।
তার দাবি, গত কয়েক বছরে তাদের এলাকায় শতাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। প্রতিবারই বাসিন্দারা নতুন করে ঘরবাড়ি নির্মাণের চেষ্টা করেছেন।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া নির্মিত স্থাপনাগুলোই ভেঙে ফেলা হয়। তবে ইসরায়েলি অধিকার সংগঠন বিমকমের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এরিয়া সিতে ফিলিস্তিনিদের বাড়ি নির্মাণের অনুমতির ৯৯ শতাংশেরও বেশি আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ হিসেবে বিবেচিত ইসরায়েলি বসতিগুলোর সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে। বসতিবিরোধী সংগঠন পিস নাউয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা ৩৪টি নতুন বসতি স্থাপনের অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে আগে গড়ে ওঠা কয়েকটি বসতিকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ও রয়েছে।
আল-জাহালিনের আশঙ্কা, বসতি সম্প্রসারণের মাধ্যমে তাদের নিজস্ব এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও তার নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোটের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে গঠিত বিরোধী শিবির।
বিরোধী জোটের আনুষ্ঠানিক নেতা ঘোষণা করা না হলেও মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টির নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে কোনো পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার অবস্থানে নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা বিরোধী শিবিরের অধিকাংশ নেতা নাকচ করেছেন।
ফিলিস্তিনিদের একাংশের আশঙ্কা, সরকারপ্রধান পরিবর্তিত হলেও পশ্চিম তীরে দখলদারত্ব, বসতি সম্প্রসারণ ও চলাচলের বিধিনিষেধের মতো মৌলিক নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে না।
‘স্টপ দ্য ওয়াল’ আন্দোলনের সমন্বয়ক জামাল জুমা বলেন, কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা ফিলিস্তিনিদের শিখিয়েছে যে ইসরায়েলে সরকার পরিবর্তন হলেই দেশটির মূল নীতিতে পরিবর্তন আসবে— এমন প্রত্যাশার যথেষ্ট ভিত্তি নেই।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৬৭ সালের পর পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি নির্মাণের সূচনা হয়েছিল দেশটির মধ্য-বামপন্থী লেবার পার্টির শাসনামলে।
জাবাল আল-বাবার বাসিন্দাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো ‘ই-১’ বসতি প্রকল্প। জেরুজালেম ও ইসরায়েলি বসতি মালে আদুমিমের মধ্যবর্তী এই এলাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম তীরের ভৌগোলিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর ফলে জাবাল আল-বাবাসহ প্রায় ১৮টি বেদুইন জনপদের বাসিন্দারা জোরপূর্বক উচ্ছেদের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
২০২৫ সালের আগস্টে ইসরায়েল ই-১ এলাকায় ৩ হাজার ৪০১টি বাড়ি নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। সে সময় দেশটির কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ বলেছিলেন, এই প্রকল্প ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণাকে কার্যত শেষ করে দেবে।
এর পরের মাসে নেতানিয়াহুও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন।
চলতি বছর নির্বাচনের আগে প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট জমি বিক্রির জন্য দুটি দরপত্র আহ্বান করে ইসরায়েল সরকার। তবে দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল নির্বাচনের পর পর্যন্ত প্রক্রিয়ার কিছু অংশ স্থগিত রাখার উদ্যোগ নিয়েছেন। স্মোত্রিচ এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন।
অন্যদিকে, আইজেনকটও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং ইসরায়েলি বসতি শক্তিশালী করার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে ই-১ প্রকল্পের দরপত্র নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এখনই নয়’। তার মতে, এই মুহূর্তে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া ভুল হবে এবং এর জন্য ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।
অর্থাৎ, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের মূল ধারণা নিয়ে বিরোধী শিবিরের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত নয়।
১৯৯০-এর দশকে অসলো চুক্তির আওতায় পশ্চিম তীরকে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’— এই তিনটি প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করা হয়। এরিয়া সিতে ইসরায়েলের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে বেশি হলেও পশ্চিম তীরের অন্যান্য এলাকাতেও ফিলিস্তিনিদের চলাচল ও দৈনন্দিন জীবন বিভিন্ন বিধিনিষেধের আওতায় রয়েছে।
জামাল জুমার অভিযোগ, ফিলিস্তিনি শহর ও গ্রামের মধ্যে চলাচল, পানি ও বিদ্যুতের সংস্থান এবং ভূখণ্ডের সীমান্তসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অনেক শহর ও গ্রামের প্রবেশপথে ফটক নির্মাণের কারণে মানুষের চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তার আশঙ্কা, এভাবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে বিচ্ছিন্ন করা হলে পশ্চিম তীরের জনপদগুলো একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো হয়ে পড়বে।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন বি’তসেলেমের মাঠপর্যায়ের গবেষণা পরিচালক কারিম জুবরান বলেন, ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুবিধা মূলত ইহুদিরাই ভোগ করছেন। ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের শাসনব্যবস্থাকে সংগঠনটি বর্ণবৈষম্যমূলক ব্যবস্থা বা ‘অ্যাপার্টহেইড’ হিসেবে বর্ণনা করে।
জুবরানের মতে, সরকার পরিবর্তন হলেও ব্যবস্থাগত বৈষম্য অব্যাহত থাকে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে ইসরায়েলের নির্বাচনের ফলাফলের চেয়ে আন্তর্জাতিক চাপ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ই-১ প্রকল্প বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে চাইলে তা সম্ভব। কিন্তু প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না থাকলে প্রকল্পটির কাজ এগিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বসতি সম্প্রসারণ ও উচ্ছেদের আশঙ্কার মধ্যে জাবাল আল-বাবার বাসিন্দারা নিজেদের ভিটেমাটি রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আল-জাহালিন জানান, তার পরিবার একসময় নাকাব অঞ্চল থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। তবে এবার তিনি নিজের আবাস ছেড়ে যেতে চান না।
তিনি বলেন, তিনি তার বাবার মতো বাস্তুচ্যুত জীবন কাটাতে রাজি নন। একজন ফিলিস্তিনি হিসেবে তিনি নিজের এলাকায় থেকে যেতে চান— বেঁচে থাকুন কিংবা মৃত্যুবরণ করুন।
ফিলিস্তিনিদের ভোটাধিকারহীনতা, বসতি সম্প্রসারণ এবং দৈনন্দিন জীবনে বিধিনিষেধের বিষয়গুলো তাই আসন্ন ইসরায়েলি নির্বাচনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে নির্বাচনের ফলাফল পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনবে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা