
ঢাকা থেকে কবি আসছেন—এই খবরটা আমার বন্ধু সবুরই পাঠিয়েছিল। সবুর বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় কর্মকর্তা। একসময় কলেজে আবৃত্তি করত, আমার কবিতাও তার কারণে কিছুটা পরিচিতি পেয়েছিল। তার এসএমএসে জানলাম, রাজধানীর একজন পরিচিত কবি একদিনের জন্য আমাদের শহরে আসবেন, আমার বাড়িতেই থাকবেন।
শহরে জাতীয় পর্যায়ের কবি নেই বললেই চলে। আমরা যারা টুকটাক লিখি, নিজেদেরই কবিতা শুনি, নিজেদেরই প্রশংসা করি। তাই রাজধানীর কোনো কবির আগমন আমাদের জন্য বড় ঘটনা।
আগেও একবার এমন আয়োজন হয়েছিল। জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে রাজধানী থেকে একজন কবিকে আনা হয়েছিল। অনুষ্ঠান হয়েছিল তার বাসাতেই। আমরা কয়েকজন কবি ও সাংস্কৃতিক কর্মী আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। আগের দিন থেকে আমরা কবিতা বেছে নিয়েছিলাম, কোনটা পড়বো—তা নিয়ে দুশ্চিন্তাও কম ছিল না। শেষ পর্যন্ত রাতভর কবিতা পাঠের আসরে অংশ নিয়েছিলাম, যদিও সেই অভিজ্ঞতা আমাদের ক্লান্তই বেশি করেছিল।
তবে সেই আসরের শেষে আমরা প্রত্যেকে ৫০০ টাকার একটি করে নোট পেয়েছিলাম। কবিতার জন্য নয়, বরং কবিতা শোনার বিনিময়ে—এটাই ছিল আমাদের প্রথম এবং হয়তো শেষ কবিতার ‘পারিশ্রমিক’।
এবার আবার রাজধানী থেকে কবি আসছেন আমাদের ছোট শহরে। আমরা সবাই খুব উৎসাহিত হলাম। ভাবলাম, এবার আমাদের কবিতাগুলো হয়তো নতুনভাবে মূল্যায়িত হবে।
বন্ধুদের মধ্যে আলোচনা শুরু হলো, কবির নাম কী, কেমন লেখেন—এসব নিয়ে কৌতূহল। কেউ মজা করে বলল, “রাজধানীর কাক আবার না চলে আসে তো!”
শিল্পকলা একাডেমির নাট্যমঞ্চে কবিতা আসরের আয়োজনের সিদ্ধান্ত হলো। শহরের কবিরা নিজেদের কবিতা বাছাই করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
নির্ধারিত দিনে সন্ধ্যায় কবি এলেন। পরিপাটি পোশাক, হাতে চামড়ার ব্যাগ। পরিচয় জানার পর জানা গেল, তিনি সবুরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ীই এসেছেন।
আলাপের শুরুতেই পুরোনো এক ঘটনার কথা উঠে এলো—অঙ্ক পরীক্ষায় খাতা বদলের গল্প। সেই স্মৃতিতে আমি কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম।
রাতের খাবার টেবিলে কবি জানালেন, এখন আর কেউ হাতে লেখে না, সবই ডিজিটাল। আমার নিজের লেখালেখির প্রসঙ্গ তুলতে গিয়েও খুব আগ্রহ পেলাম না।
পরদিন কবিকে নিয়ে আমরা মাঠে গেলাম। তিনি গ্রামীণ প্রকৃতি দেখতে চাইলেন। ধানক্ষেত, কৃষকদের সঙ্গে কথা বলা—সবই মনোযোগ দিয়ে দেখলেন তিনি। আমি কিছুটা দূর থেকে সব দেখছিলাম।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল পর্যন্ত তিনি মাঠেই সময় কাটালেন এবং কিছু নোট নিলেন।
সন্ধ্যায় শুরু হলো মূল অনুষ্ঠান। শহরের কবিরা একের পর এক নিজেদের কবিতা পাঠ করলেন। আমি নিজেও কবিতা পড়লাম, অন্যদের তুলনায় একটু বেশি সংখ্যায়।
কবি চুপচাপ সব শুনলেন। মাঝে মাঝে শুধু মাথা নাড়লেন। দীর্ঘ সময় কবিতা শোনার পর তিনি মাইক্রোফোন হাতে কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন।
শেষে তিনি সংক্ষেপে বললেন, তিনি দুঃখিত যে নিজে কিছু শোনাতে পারেননি, তবে আমাদের কবিতাগুলো ভালো লেগেছে।
বাসে তুলে দেওয়ার সময় কবি হালকা হেসে বললেন, তিনি আসলে অন্য পরিচয়ে এখানে এসেছিলেন। পরে পরিস্থিতির কারণে সবাই তাকে কবি হিসেবেই জানল।
তিনি বিদায় নিয়ে চলে গেলেন, আর আমাদের শহরে থেকে গেল এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা—কবিতা, ভ্রমণ, স্মৃতি আর কিছুটা বিভ্রান্তি মিশে থাকা একটি গল্প।