
ঢাকার শেরেবাংলা নগরের পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা ‘শিক্ষার্থীদের রক্তের ওপর দিয়ে’ বাস্তবায়ন করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। মাঠটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে শিক্ষকরা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতামত ও জনমত উপেক্ষা করে ওই মাঠে সচিবালয় স্থাপন করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না। তাঁদের দাবি, মাঠটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নগরীর সবুজ এলাকা রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, পরিবেশবাদী ও ঢাকার বাসিন্দারা জনবান্ধব পরিবেশ ধ্বংস করে সেখানে সচিবালয় স্থাপনের পক্ষে নন। জনমত এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতামত উপেক্ষা করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে জনগণ ও শিক্ষার্থীরা তা মেনে নেবেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রফিকুল ইসলাম বলেন, “যদি সেটি করতে হয়, ছাত্রদের রক্তের ওপর দিয়ে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে।” তবে সরকার এ বিষয়ে অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত নেবে না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠটি বাণিজ্য মেলার জন্য ব্যবহার করা শুরু হয়। সে সময় শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মাঠটিতে আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, গবেষণা প্লট ও ফার্ম ছিল। সেগুলো সরিয়ে সেখানে বাণিজ্য মেলার কার্যক্রম শুরু করা হয়। দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় তখন বিষয়টি সমর্থন করেছিল।
অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, বাণিজ্য মেলা পূর্বাচলে স্থানান্তরের পর মাঠটি ফিরে পেতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন দপ্তরে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আবেদন করেছে। এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা, ঢাকা জেলা প্রশাসক, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছেও আবেদন জানানো হয়েছে।
সম্প্রতি ওই মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়ে সরকারের চিন্তাভাবনার কথা জানা যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে সচিবালয় নির্মাণ করা হলে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে ঢাকা শহরের পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার স্বার্থে নয়, ঢাকার পরিবেশ, সৌন্দর্য এবং সবুজ এলাকা রক্ষার জন্যও মাঠটি ফিরিয়ে পাওয়া প্রয়োজন।
পরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে সংবাদ সম্মেলন করে ‘বাণিজ্য মেলার মাঠ পুনরুদ্ধার কমিটি’। এতে কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এম সালাহউদ্দিন এম চৌধুরী বলেন, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রাজধানীর মধ্যে একটি সবুজ গ্রামের মতো। এর পাশে ঐতিহাসিক জিয়া উদ্যান রয়েছে, যেখানে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিস্থল অবস্থিত। এই দুই স্থাপনার মাঝখানে বড় কংক্রিটের ভবন নির্মাণ করা হলে এলাকার ছায়াঘেরা পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হবে।
অধ্যাপক সালাহউদ্দিন বলেন, ঢাকায় কতটুকু সবুজ জায়গা অবশিষ্ট রয়েছে, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আগামী ২০ থেকে ৩০ বছর পর শহরের পরিবেশ কেমন হবে, সে বিষয়েও এখনই ভাবতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পর্যাপ্ত গাছপালা, নিরাপদে হাঁটার রাস্তা, পার্ক, খেলার মাঠ ও নির্মল পরিবেশ পাবে কি না, তা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতামত উপেক্ষা করে কংক্রিটের স্থাপনা বাড়ানো হলে শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ব্যাহত হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এতে শিশু, প্রবীণ ও সাধারণ মানুষের হাঁটাচলা এবং মুক্তভাবে শ্বাস নেওয়ার জায়গা কমে আসার আশঙ্কাও প্রকাশ করেন। পাশাপাশি মাঠটি না পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি গবেষণার পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলন শেষে মাঠটি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে শিক্ষকদের একটি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে স্মারকলিপি দেয়।
উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সাল থেকে ঢাকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা শেরেবাংলা নগরের ওই মাঠে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। ২০২২ সাল থেকে মেলাটি পূর্বাচলের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্রে আয়োজন করা হচ্ছে।
এর মধ্যে গত ৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে মাঠটি পুনরুদ্ধারের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।