বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র কেন্দ্রীয় কাঠামোয় দীর্ঘদিন ধরে শূন্যপদ সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। দলটির জাতীয় নির্বাহী কমিটির শতাধিক পদ নানা কারণে খালি পড়ে রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটি’র ৫টি গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় দলীয় কার্যক্রম পরিচালনায় বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করছেন শীর্ষ নেতারা।
দলীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় কমিটি হালনাগাদ না হওয়ায় তৃণমূল থেকে নতুন নেতৃত্বের বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি উত্তরণে প্রায় এক দশক পর কেন্দ্রীয় কাউন্সিল আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হতে পারে দলটির ৭ম জাতীয় কাউন্সিল।
প্রস্তাবিত এই কাউন্সিলের মাধ্যমে মূলত স্থায়ী কমিটির শূন্য ৫টি পদসহ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির শতাধিক শূন্য পদ পূরণ এবং সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্ব বিকাশকে ত্বরান্বিত করাই হবে এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
তবে জাতীয় কাউন্সিল ছাড়াই স্থায়ী কমিটির শূন্য পদগুলো পূরণের বিষয়েও দলের ভেতরে আলোচনা চলছে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিএনপির চেয়ারম্যান প্রয়োজনে তার ক্ষমতাবলে কাউন্সিলের আগেই এসব পদে নিয়োগ দিতে পারেন—এর আগেও এমন নজির রয়েছে।
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী স্থায়ী কমিটির সদস্য সংখ্যা ১৯ জন। কিন্তু বার্ধক্যজনিত কারণ, মৃত্যু, পদত্যাগ ও রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে বর্তমানে ৫টি পদ শূন্য রয়েছে। সর্বশেষ মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ায় স্থায়ী কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন।
বর্তমানে ১৪ জন সদস্য নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে এই সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম। তাদের মধ্যেও কয়েকজন বয়সজনিত অসুস্থতায় ভুগছেন, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও ধীর করে দিচ্ছে।
বিএনপির মহাসচিব Mirza Fakhrul Islam Alamgir ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, দলের জাতীয় কাউন্সিল “শিগগিরই” অনুষ্ঠিত হবে। যদিও এখনো নির্দিষ্ট সময় ঘোষণা করা হয়নি, তবে বছর শেষ হওয়ার আগেই কাউন্সিল সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দলের অভ্যন্তরে শূন্য পদগুলো পূরণ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং যুগ্ম মহাসচিব পর্যায়ের প্রায় ২০ জন নেতার নাম স্থায়ী কমিটির সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
গত কয়েক বছরে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, তরিকুল ইসলাম এবং আ স ম হান্নান শাহর মতো প্রভাবশালী নেতাদের মৃত্যুর কারণে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে শূন্যতা তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা আরও তীব্র হয়েছে।
সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর অন্তর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও নানা রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কারণে তা সম্ভব হয়নি।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপির চেয়ারম্যান Tarique Rahman দীর্ঘদিন দেশে অনুপস্থিত থাকা, সাবেক চেয়ারপারসন Khaleda Zia-র আইনি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পূর্ববর্তী সরকারের দমন-পীড়নের কারণে কাউন্সিল আয়োজন বিলম্বিত হয়েছে।
এই দীর্ঘ সময়ে অনেক নেতা মৃত্যুবরণ করেছেন, কেউ দল ত্যাগ করেছেন, আবার কেউ স্বেচ্ছায় রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছেন। ফলে বর্তমানে স্থায়ী কমিটির ৫টি, ভাইস চেয়ারম্যানের ১৬টি এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার ১০টি পদ শূন্য রয়েছে। সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির শতাধিক পদ এখনও খালি।
স্থায়ী কমিটির শূন্য ৫টি পদে অন্তর্ভুক্তির জন্য কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। ভাইস চেয়ারম্যানদের মধ্যে বরকত উল্লাহ বুলু, আব্দুল আউয়াল মিন্টু, কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ, শামসুজ্জামান দুদু, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, ড. আসাদুজ্জামান রিপন, অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম খান, নিতাই রায় চৌধুরী ও নূরুল ইসলাম মনির নাম শোনা যাচ্ছে।
এছাড়া উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির, অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, হারুনুর রশিদ, জহির উদ্দিন স্বপন, আফরোজা খানম রিতা ও আমিনুর রশিদ ইয়াসিন আলোচনায় রয়েছেন।
পাশাপাশি যুগ্ম মহাসচিব পর্যায় থেকেও কয়েকজনের নাম সামনে এসেছে, যেমন—রুহুল কবির রিজভী, শহিদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, হাবিবুন নবী খান সোহেল এবং অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল।
সব মিলিয়ে, বিএনপির কেন্দ্রীয় কাঠামো পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের শূন্যতা পূরণ এবং নতুন নেতৃত্বের বিকাশ নিশ্চিত করতে আসন্ন জাতীয় কাউন্সিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন দলীয় নেতারা। এখন দেখার বিষয়, কাউন্সিলের মাধ্যমে দলটি কতটা কার্যকরভাবে সাংগঠনিক পুনর্গঠন সম্পন্ন করতে পারে।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু অনুমতি ছাড়া ব্যবহারযোগ্য নহে