দেশে হামের সংক্রমণ নতুন করে উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার চিত্রে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যেখানে নতুন করে আরও ৮ শিশুর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় এই মৃত্যুগুলো ঘটেছে। মৃতদের মধ্যে ২ শিশুর মৃত্যু সরাসরি হামে নিশ্চিত হয়েছে, আর বাকি ৬ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। এ সংখ্যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে সারা দেশে ১ হাজার ১৯১ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। এর ফলে চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৩৫২ জনে। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, সংক্রমণের হার দ্রুতগতিতে বাড়ছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ৩৪ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বিবেচনায় নিলে প্রকৃত মৃত্যুহার আরও বেশি হতে পারে। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই পরীক্ষার সুযোগ বা রিপোর্ট না থাকায় সব মৃত্যুকে নিশ্চিত হামের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয় না।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হলো টিকাদানের ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাব। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও প্রান্তিক এলাকায় অনেক শিশু এখনো নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে রয়েছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের জনসমাগম—যেমন উৎসব, মেলা বা সামাজিক অনুষ্ঠান—সংক্রমণ বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলছেন, হাম সাধারণ জ্বর বা ফুসকুড়ির মতো হালকা রোগ নয়। এটি থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে, যা শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তাই উপসর্গ দেখা দিলেই দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জনগণের প্রতি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—শিশুদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী হাম-রুবেলা টিকা নিশ্চিত করা, আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা, এবং জ্বর বা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। একই সঙ্গে জনসমাগম এড়িয়ে চলার কথাও বলা হচ্ছে, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে।
এদিকে স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আক্রান্ত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে বিশেষ নজরদারি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানো দরকার। মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
সার্বিকভাবে, দেশের বর্তমান হামের পরিস্থিতি একটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকেত দিচ্ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সংক্রমণ আরও বিস্তার লাভ করতে পারে এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং টিকাদান কর্মসূচির সর্বোচ্চ বাস্তবায়ন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া গেলে এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। অন্যথায় এটি আরও বড় আকার ধারণ করে শিশুস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়