আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও সংঘাতের পর দুই দেশের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, আগামী দুই দিনের মধ্যেই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা যেতে পারে এবং এই আলোচনার জন্য পাকিস্তানকে সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আপনাদের সেখানেই থাকা উচিত। কারণ আগামী দুই দিনের মধ্যে কিছু একটা ঘটতে পারে। আমরা সেখানে (পাকিস্তান) যাওয়ার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী।” তার এই মন্তব্যে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে—দুই দেশের দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কি এবার আলোচনার মাধ্যমে প্রশমিত হতে যাচ্ছে?
তবে এখনো পর্যন্ত ইরান সরকারিভাবে কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তেহরান ও ইসলামাবাদের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অর্থাৎ, আলোচনা শুরু নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি।
এর আগে গত পাঁচ সপ্তাহ ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছিল। এই সংঘাতের পর গত ৭ এপ্রিল পাকিস্তান-এর মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে দুই সপ্তাহের একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। এই চুক্তিকে ঘিরেই আলোচনার নতুন দ্বার উন্মুক্ত হয় বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
এই প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়তে থাকে। পাকিস্তান নিজেকে একটি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরতে চেষ্টা করছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে দেশটির গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
গত শনিবার (১১ এপ্রিল) ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকও এই আলোচনার ধারাবাহিকতার অংশ ছিল। সেখানে অংশ নেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফসহ অন্যান্য উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা। যদিও বৈঠকটি শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়, তবুও এটিকে ভবিষ্যৎ আলোচনার ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানকে আলোচনার স্থান হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে একাধিক কৌশলগত কারণ রয়েছে। প্রথমত, ইসলামাবাদ উভয় দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশের বাইরে একটি তুলনামূলক নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য ভেন্যু হিসেবে পাকিস্তানকে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলোচনায় আগ্রহ প্রকাশ পেলেও ইরানের সতর্ক অবস্থান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। তেহরান বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত আরোপ করে এসেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তারা আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই অবস্থায় আগামী দুই দিন আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী যদি কোনো অগ্রগতি ঘটে, তাহলে তা শুধু দুই দেশের সম্পর্কেই নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি এক অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। যুদ্ধবিরতির পর আলোচনা শুরু হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তবে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যদি নতুন করে সংলাপ শুরু হয়, তাহলে তা দীর্ঘদিনের উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন দেখার বিষয়—আগামী দিনগুলোতে কূটনৈতিক তৎপরতা কোন দিকে মোড় নেয়।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়