
মাত্র ২০ মিনিটে ১০টি ব্লকচেইন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্স থেকে উধাও হয়েছে ৬৩০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। একক সাইবার হামলায় ক্রিপ্টো সম্পদ চুরির ইতিহাসে এটিকে সবচেয়ে বড় ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবর বাইন্যান্সের হট ওয়ালেটে এ সাইবার হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা মাত্র ২০ মিনিটে বিভিন্ন ব্লকচেইন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ ক্রিপ্টো সম্পদ সরিয়ে নেয়। কীভাবে ঘটল এত বড় চুরি, কারা জড়িত এবং কতটা অর্থ উদ্ধার সম্ভব হয়েছে—এসব প্রশ্ন এখন ক্রিপ্টো দুনিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রে।
২০ মিনিটে কীভাবে চুরি হলো এত অর্থ?
হট ওয়ালেট হলো ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত ডিজিটাল ওয়ালেট। গ্রাহকদের দ্রুত লেনদেনের সুবিধা দিতে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জগুলো এতে অর্থ সংরক্ষণ করে। অন্যদিকে কোল্ড ওয়ালেট ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় অনলাইন হামলার ঝুঁকি তুলনামূলক কম।
বাইন্যান্সের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটির এক প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক করার মাধ্যমে হামলাকারীরা সিস্টেমে প্রবেশ করে থাকতে পারে। তবে হামলার পুরো কৌশল জানতে তদন্ত চলছে।
ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হ্যাকাররা ইথেরিয়াম নেটওয়ার্কের একটি প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার অপব্যবহার করে ওয়ালেটের অর্থ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।
তবে বাইন্যান্স জানিয়েছে, তাদের প্রাইভেট কি বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা চাবি ফাঁস হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
চুরি হওয়া অর্থের কতটা উদ্ধার হয়েছে?
হামলার পরপরই চুরি হওয়া অর্থের গতিপথ শনাক্ত ও আটকে দেওয়ার উদ্যোগ নেয় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং ব্লকচেইন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান।
বাইন্যান্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ ফ্রিজ করা সম্ভব হয়েছে। এ কাজে টেথার, সার্কেল ও রিপলের মতো প্রতিষ্ঠান সহায়তা করেছে।
তবে সম্পদ ফ্রিজ করা মানেই তা উদ্ধার হওয়া নয়। ফ্রিজ করার অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট সম্পদ আপাতত ব্যবহার বা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া কঠিন করে দেওয়া। প্রকৃত মালিকের কাছে অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া আলাদা প্রক্রিয়া।
অন্যদিকে বাকি অর্থের বড় অংশ বিটকয়েন ও ইথারের মতো বিকেন্দ্রীভূত ক্রিপ্টোকারেন্সিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। এসব মুদ্রা কোনো একক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করে না। ফলে অর্থের অবস্থান শনাক্ত করা গেলেও সরাসরি আটকে দেওয়া কঠিন।
কারা এই হামলার পেছনে?
হামলার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হ্যাকারদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে মনে করছেন ব্লকচেইন বিশ্লেষকেরা।
টিআরএম ল্যাবসের দাবি, এ হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকিং ইউনিট ট্রেডারট্রেটরের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ রয়েছে। লাজারাস গ্রুপের পরিচিত কৌশলের সঙ্গেও হামলার মিল পেয়েছে বিভিন্ন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান।
ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নয়। দেশটির হ্যাকারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে হামলা চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
টিআরএম ল্যাবসের পলিসি বিভাগের প্রধান আরিয় রেডবোর্ডের মতে, উত্তর কোরিয়ার চুরি করা অর্থ দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র ও সামরিক কর্মসূচিতে অর্থায়নের ঝুঁকি তৈরি করে। তবে বাইন্যান্স থেকে চুরি হওয়া অর্থ সরাসরি উত্তর কোরিয়ার হাতে পৌঁছেছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেল বাইন্যান্স
ক্রিপ্টো দুনিয়ায় এর আগেও বড় ধরনের চুরির ঘটনা ঘটেছে। ২০১৪ সালে মাউন্ট গক্স থেকে প্রায় ৪৭ কোটি ডলার, ২০১৮ সালে কয়েনচেক থেকে ৫৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার এবং ২০২১ সালে পলি নেটওয়ার্ক থেকে ৬১ কোটি ১০ লাখ ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরি হয়। ২০২২ সালে রোনিন নেটওয়ার্কে হামলায় খোয়া যায় প্রায় ৬২ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাইবিট থেকে চুরি হয় প্রায় ১৪৬ কোটি ডলারের সম্পদ। এত দিন একক সাইবার হামলায় ক্রিপ্টো চুরির সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল এটি।
টিআরএম ল্যাবসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় ১৫০টি হ্যাকিংয়ের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে ২৮৭ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরি হয়েছিল। বাইন্যান্সে এক হামলাতেই চুরি হওয়া অর্থ সেই বার্ষিক পরিমাণের দ্বিগুণেরও বেশি।
গ্রাহকদের অর্থ কি নিরাপদ?
হামলার পর বাইন্যান্সের গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্ল্যাটফর্মে জমা রাখা অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাইন্যান্সের সহপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিচার্ড টেং ও প্রতিষ্ঠাতা চ্যাংপেং ঝাও গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, তাদের মূল তহবিল নিরাপদ রয়েছে।
চুরি হওয়া অর্থের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ জন্য ব্যবহার করা হবে তাদের ‘সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজার্স’ বা সাফু তহবিল। প্রয়োজনে নিজস্ব করপোরেট তহবিল থেকেও অর্থ দেওয়া হবে।
তবে ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও প্ল্যাটফর্মটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কীভাবে এমন হামলা সম্ভব হলো, তা শনাক্ত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
ক্রিপ্টো বাজারে কী প্রভাব পড়েছে?
বাইন্যান্সে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ক্রিপ্টো বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। বিটকয়েনের দাম ৫ শতাংশের বেশি কমে ৭৭ হাজার ডলারের নিচে নেমে আসে। দরপতন হয় ইথেরিয়াম ও বাইন্যান্সের নিজস্ব টোকেন বিএনবির দামেও।
এ ঘটনায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সিডনির ম্যাককুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিপ্টো বিশেষজ্ঞ শেন ফোলির মতে, বাইন্যান্সের মতো বড় প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তার দুর্বলতা ধরা পড়া বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের আঘাত হেনেছে।
তদন্তে এফবিআই ও সিক্রেট সার্ভিস
চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই ও সিক্রেট সার্ভিস। বাইন্যান্সের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্লকচেইন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানও অর্থের গতিপথ অনুসরণ করছে।
হ্যাকারদের ওয়ালেট শনাক্ত করা, অর্থের স্থানান্তর ঠেকানো এবং বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া সম্পদ আটকে দেওয়াই এখন প্রধান লক্ষ্য। তবে বিকেন্দ্রীভূত ব্লকচেইনে স্থানান্তরিত সম্পদ উদ্ধার করা কঠিন হতে পারে।
ক্রিপ্টো দুনিয়ার জন্য বড় সতর্কবার্তা
বাইন্যান্সের এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, বড় বিনিয়োগ ও উন্নত প্রযুক্তির নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলেও ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠানগুলো সাইবার হামলার ঝুঁকিমুক্ত নয়। একটি দুর্বলতাই বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল সম্পদ হারানোর কারণ হতে পারে।
এ ঘটনা বিনিয়োগকারীদের আস্থা, আন্তর্জাতিক অর্থপাচার এবং ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। চুরি হওয়া ৬৩০ কোটি ডলারের মধ্যে শেষ পর্যন্ত কতটা উদ্ধার করা সম্ভব হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।