
টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণ, জোয়ারের পানি এবং অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের প্রায় ৮০টি গ্রাম এখনো জলাবদ্ধতায় ডুবে রয়েছে। কিছু এলাকায় পানি কমতে শুরু করলেও অন্তত ৫০ হাজার মানুষ এখনও পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
জলাবদ্ধতার কারণে বহু পরিবারের রান্নার চুলা পানিতে তলিয়ে গেছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে এবং অনেক পরিবার শুকনো খাবার খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। একই সঙ্গে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
উপজেলার নিঝুমদ্বীপ, সোনাদিয়া, বুডিরচর, হরনী, চানন্দী, চরকিং, সুখচর, নলচিরা, জাহাজমারা, তমরদ্দি ও চর ঈশ্বর ইউনিয়নসহ হাতিয়া পৌরসভার অধিকাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক স্থানে বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক ও বাজার পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ঘরের ভেতর হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, টানা বৃষ্টির সঙ্গে জোয়ারের পানি যুক্ত হওয়ায় নিচু এলাকার পানি বের হতে পারেনি। ফলে ঘরবাড়ি, রান্নাঘর, টয়লেট ও গবাদিপশুর আশ্রয়স্থল পর্যন্ত পানির নিচে চলে গেছে।
এদিকে জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষি ও মৎস্য খাত। হাজার হাজার একর আমনের বীজতলা, মৌসুমি সবজির ক্ষেত ও মাছের ঘের পানিতে ডুবে গেছে। অনেক ঘের থেকে মাছ ভেসে যাওয়ায় ক্ষুদ্র মৎস্যচাষীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
জলাবদ্ধতার কারণে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ ও শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচলও প্রায় বন্ধ। জরুরি রোগীদের হাসপাতালে নিতে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে স্বজনদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, খাল-নালা ভরাট এবং টেকসই বেড়িবাঁধের অভাবে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
নিঝুমদ্বীপের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, “টানা বৃষ্টিতে রান্নাঘর ডুবে গেছে। ছোট সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। দ্রুত পানি না নামলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।”
বুডিরচরের কৃষক মো. কামাল উদ্দিন বলেন, “আমনের বীজতলা, সবজির ক্ষেত ও মাছের ঘের সব নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে চাষ করার মতো পুঁজিও নেই।”
হাতিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আনিসুর রহমান জানান, উপজেলার প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাসেল ইকবাল বলেন, হাতিয়া নদীবেষ্টিত হওয়ায় এবং কয়েকটি এলাকায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক এলাকায় পানি নামতে শুরু করেছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় ২৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং প্রতিটি ইউনিয়নে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় এক হাজার পরিবারের মধ্যে ত্রাণ সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে।
এদিকে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও এখনো অনেক এলাকায় পানি নামেনি। ক্ষতিগ্রস্তরা দ্রুত পানি নিষ্কাশন, পর্যাপ্ত ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং কৃষক ও মৎস্যচাষীদের পুনর্বাসনে জরুরি সরকারি উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন।